নবম পরিচ্ছেদ উপনিষদসমূহ তোমার মহাদেব-উপদানকে স্মরণ করায়
নবম পরিচ্ছেদ উপনিষদসমূহ তোমার মহাদেব-উপদানকে স্মরণ করায়
পরিচ্ছেদ ১০ মহাজগতের মত জীবনযাপন করার জন্য মহাজাগতিক চেতনা উপনিষদসমূহ হল প্রথম, অগ্রণী ও অন্তিম কথা, বৃক্ষকে বৃক্ষাণ্ডের দেওয়া, মানবজাতিকে মহাজগতের দেওয়া। প্রতিটি উপনিষদ মন্ত্র হল মহাজগতের মত বাস করার জন্য মহাজাগতিক চেতনা 59 উপনিষদসমূহ বিজ্ঞানের মত প্রতিদিন বিকশিত হচ্ছে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আজ এক বিজ্ঞানী কোন কিছুকে সত্য বলে ঘোষণা করল এবং সবাই তা সত্য বলে মনে নিল। সেই সত্যকে ভিত্তি করে মানুষেরা তাদের জীবনের নির্নয়গুলি নিল ও জীবনকে সেইভাবে সারিবদ্ধ করল। তারপর লোকেরা জীবনকে সেইভাবে সারিবদ্ধ করবে। তার পাঁচ বছর পরে, অন্য কেউ আসবে ও সেটাকে ভুল বলে ঘোষণা করবে এবং অন্য কিছুকে সত্য বলে প্রমাণ করবে। এটা বুঝে নাও, সত্য যদি আগামীকাল পরিবর্তিত হতে থাকে, তা আজকেও সত্য নয়। উপনিষদ বিজ্ঞানের মত নয়, বিজ্ঞান তো বিকশিত ও পরিবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞানী যেন এক বিজ্ঞানী ঘন জঙ্গলের অন্ধকারে একটা লঠন নিয়ে গেছে, আর জঙ্গল সম্পর্কে সত্য বলছে, 'এখানে দশটি গাছ আছে, দুটি সাপ আছে এবং অন্ধকার...'। যখন সে জঙ্গলে আরেকটু ঢোকে, সে বলে, 'না! জঙ্গলে কেবল দশটি গাছ ও দুটি সাপ নয়; এখানে পঁচিশের বেশী গাছ এবং দুটি হাতিও আছে।' জঙ্গলের আরও গভীরে গিয়ে সে বলে, 'না! কেবল পঁচিশটা গাছ নয়। যেদিকেই আমি লঠন ধরি, চারিদিকে গাছ আর গাছ আর গাছ এবং বিভিন্ন প্রকার পশু!' এটাই হল বিজ্ঞান। কিন্তু উপনিষদসমূহ হল, ঋষিগণ উপবেশন ক'রে বজ্রের এক ঝলকে সম্পূর্ণ জঙ্গল দেখে তার বর্ণনা করেন। এই দুটির মধ্যে পার্থক্য বোঝ। লঠন দ্বারা দেখা বর্ণনা তো সর্বদাই পরিবর্তিত হতে থাকবে। কিন্তু ঋষিরা পাহাড়ের চুড়ায় বসে সমস্ত জঙ্গলকে বিস্তৃতির এক ঝলক দ্বারা দেখে নিয়ে তা লিখে রাখা হল উপনিষদসমূহ! সত্য সকল ঘোষণা করার জন্য উপনিষদসমূহের মত এত হৃদয়স্পর্শী আর কিছুই নেই ; জীবনযাপনের অতি সুন্দর উপায় ও সহজে ব্যবহারযোগ্য ! তোমার সম্পূর্ণ চেতনাকে শুদ্ধ কর ও তাকে প্রস্তুত রাখ! ভগবৎ গীতাকে উপনিষদের মত বলা হয়েছে, উপনিষদ নয়! হিন্দু প্রথাতে এমনকি অবতারগণের বাণীও উপনিষদের স্তরে রাখা হয় নি। শ্রুতি, যা শ্রবণ করা হয়েছে! উপনিষদ কোন ঋষি বলেন নি, তা ঋষিগণ শ্রবণ করেছেন। উপনিষদ হল সরাসরি মহাজগতের নিজের সম্বন্ধে মহাজগত্কে মহাজাগতিকভাবে ঘোষণা করা। তাই হল মহাজগতের নিজের সম্পর্কে গীত গাওয়া! জীবন সম্বন্ধে তোমার সমস্ত পুরাতন ধারণাগুলিকে মুছে ফেল। ঈশ্বর সম্পর্কে তোমার পুরাতন ধারণা মুছে ফেল। নিজের সম্পর্কে , বিশ্ব সম্পর্কে তোমার সমস্ত বোধগুলিকে ফেলে দাও। তোমার পুরাতন ধারণাগুলিকে ফেলে দাও এবং ঝরঝরে তাজা হয়ে ওঠ সরাসরি মহাজগৎ থেকে আদি মহাজাগতিক চেতনা গ্রহণ করার জন্য , মহাজগৎ যেভাবে চায় সেভাবে তোমার জীবনযাপন করার জন্য। উপনিষদসমূহ এতই সরস ও মসলাদার ! এগুলি শুষ্ক পুস্তক নয়। এগুলি অসাধারণ উপলব্ধি প্রদান করে ! এগুলি রসে ভরা; এগুলির সৌন্দর্য অনেক; এগুলিতে প্রচুর আনন্দ! এগুলি এতই সজীবতায় ভরা। উপনিষদের প্রতিটি মন্ত্র তোমার জন্য মহাজগৎ হয়ে জীবনযাপন করার জন্য এক মহাজাগতিক চেতনা। তোমার নিজের সাথে সম্পর্কতা, তোমার ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কতা, জীবনের সাথে তোমার সম্পর্কতা, জীবনের সাথে তোমার সম্পর্কতা, সবকিছুর সাথে তোমার সম্পর্কতা উপনিষদের মন্ত্রগুলি দ্বারা নিরূপণ ও পুনর্নির্ধারণ করা যায়। উপনিষদের মন্ত্রসমূহ কতই না নিগূঢ়! উপনিষদের মন্ত্রগুলি পৃথীগ্রহে শোনা যে কোন শব্দের চাইতে অনেক বেশী শক্তিশালী। এমন শক্তিশালী স্পন্দনে এই শক্তিশালী সত্যসকল তুমি গ্রহণ করতে যাচ্ছ। নিজেকে তৈরি কর, নিজের সম্পর্কে তোমার পুরানো ধারণা মুছে ফেল, সেগুলির সাথে পূর্ণত্ব কর, কারণ তুমি পূর্ণের সাথে পূর্ণত্ব করতে যাচ্ছ এবং সম্পূর্ণ পূর্ণতার আকাশে প্রবেশ করতে যাচ্ছ, যাকে উপনিষদসমূহ বর্ণনা করে মহাজগতের অবস্থা হিসাবে, ব্রহ্মাত্মের অবস্থা হিসাবে। মহাজাগতিক উপলব্ধির জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও, কারণ উপনিষদসমূহের প্রতিটি শ্লোক হল জীবনসম্মতিসূচক। উদাহরণস্বরূপ, একটি উপনিষদের দ্বিতীয় শ্লোক বলে, ‘এইপ্রকার মুক্তজীবনে শত বৎসর বাঁচার নির্ণয় নাও।’ কি দারুণ জীবনসম্মতিসূচক বিজ্ঞান! এতে নেতিবাচক বা নাকারাত্মক জীবনের কোন আভাসই নেই। আর প্রত্যেকে যারা এই মন্ত্রগুলি শোনে, তাদের ডি এন এ (DNA) শতায়ু হওয়ার নির্ণয় নেবে, নির্ণয় গ্রহণ করার সহায়তা পাবে ও সেইভাবে প্রোগ্রামিং করা হবে। কেবলমাত্র এই মহাজাগতিক চেতনাগুলি প্রদান করাই নয়, সেগুলি তোমার অন্তঃসার হওয়ার নির্ণয় নেবে। বা ডি এন এ হয়ে যায়, তোমার জৈবস্মৃতি ও পেশীস্মৃতি তৈরি হয়! তোমার জৈবস্মৃতিকে উপনিষদসমূহে প্রোগ্রামিং করা হয়; তোমার ডি এন এ, তোমার পেশীস্মৃতি ও জৈবস্মৃতিকে উপনিষদসমূহে পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাস করা হয়। প্রতিটি মন্ত্রকে শ্রবণ করা উচিত, ভালবাসা উচিত, আত্মস্থত করে বিকিরণ করে ও সমৃদ্ধকরণ করে জীবনযাপন করা উচিত ! এই নতুন চেতনা সহকারে জীবনযাপন করার জন্য পুরাতন ধারণাগুলিকে মুছে ফেলে প্রস্তুত হও। পুরাতন ধারণাগুলিকে মুছে ফেলে, উপনিষদসমূহকে তোমার অস্তঃসারে, তোমার ডি এন এ-তে রেকর্ড করা হল মহাজাগতিক চেতনা। সম্পূর্ণ হিন্দুধর্মে বৈদিক প্রথার জন্য প্রস্থাবলী হল উপনিষদসমূহ। এখানে ঋষিপণ বিশ্বব্রক্ষাণ্ডকে প্রধান সারবানী প্রদান করেছেন। ধর্ম, বিশ্বে মহাজাগতিক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া - এটাই সবচেয়ে বড় সেবা যা মানুষ পৃথিবীতে করতে পারে। একবার এই উপনিষদসমূহ সম্বন্ধে বলা হয়ে গেলে এই গ্রন্থ সমস্ত বৈদিক প্রথার সারগ্রন্থ হয়ে যাবে! খুবই বিনয় সহকারে, মহাজগতে মহত্তম আধ্যাত্মিক ঘটনাগুলির মধ্যে একটি এখন ঘটছে এই উপনিষদসমূহের প্রকাশে, উপনিষদসমূহের আকাশলেখন পাঠে। আমি টীকা বা মন্তব্য করতে যাচ্ছি না; আমি কেবল ব্যাখ্যা করতে যাচ্ছি উপনিষদের ধ্বনিরা যে প্রসঙ্গ (context) থেকে প্রকাশ করেছিলেন, শ্লোকের আগে ও পরে। আমি তার পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছি। উপনিষদসমূহ উপভোগ করার জন্য, অভিজ্ঞতা করার জন্য, বিকিকরণ করার জন্য প্রস্তুত হও। তোমারা সকলে শিবগণ হয়ে সরাসরি মহাদেবের আকাশ থেকে উপনিষদসমূহ গ্রহণ কর এবং তাকে জীবনে ধারণ কর, তা নিয়ে জীবনযাপন কর! তোমার সমস্ত পুরাতন ধারণাগুলির সাথে পূর্ণত্ব কর। মহাজাগতিক চৈতন্যকে নিজ চেতনা হিসাবে পাবার জন্য প্রস্তুত হও। উপনিষদের ঋষিগণ সমগ্র বিশ্বকে যা প্রদান করেছিলেন তা যেন আমরা গ্রহণ করতে পারি, সেইজন্য তাঁরা যেন আমাদের মধ্য দিয়ে বিকিরণ করেন ও আমাদের আশীর্বাদ করেন। আদি ঋষি, আদি গুরু মহাদেব, যিনি উপনিষদসমূহ সপ্ত ঋষি এবং সনত, সনতকুমার, সনাতন, সনকাদি এই চার শাশ্বত ঋষিদের মধ্যে সঞ্চারিত করেন, তাঁর কাছে আমরা প্রার্থনা করি এই মহান সত্যসকল প্রকাশ করার জন্য এবং যাতে পূর্ণ হয় আমাদের সকলের জীবন ও অভিজ্ঞতা করি শিবোহম্।