অষ্টম পরিচ্ছেদ অদ্বৈত জীবন, উপনিষদসমূহের সুগন্ধসার
অষ্টম পরিচ্ছেদ অদ্বৈত জীবন, উপনিষদসমূহের সুগন্ধসার
পরিচ্ছেদ ৯ উপনিষদসমূহ তোমার মহাদেব-উপাদানকে স্মরণ করায় মহাদেব-উপাদান, যা তোমার ইচ্ছা পূরণ করে, যা আপনাকে নিজের সম্বন্ধে খুবই সুন্দর অনুভূতি প্রদান করে , তা হল প্রকৃত তুমি। তা কেউ ছিন্ন করতে, দগ্ধ করতে বা তোমার থেকে সরিয়ে ফেলতে পারে না! উপনিষদসমূহে অতিরিক্ত কিছুই বলা হয় নি। এতে কোন সম্পাদনা (এডিটিং) বা ভাষ্য ও টীকা সম্ভব নয়। তা এত সুব্যক্ত ও যথার্থ! তাতে অতিরিক্ত কিছু যোগ করা যায় না। হয়ত তাতে কোনকিছু হাইলাইট ক'রে বারবার পুনরাবৃত্তি করতে পারা যায়। জীবনে শ্রেষ্ঠ হবার জন্য, তোমার সর্বোচ্চ সম্ভাবনাতে পৌঁছানোর জন্য যে ঐশ্বরিক জ্ঞান, ঈশ্বর বোধ প্রয়োজন, তা উপনিষদসমূহে সম্পূর্ণরূপে আছে। পাশে কোন লোককে বসে থাকতে দেখলে তুমি কেমন অনুভব কর; পাশে বসা একটি কুকুর দেখে তুমি কি অনুভব কর; সামনে একটি গাছ দেখলে তুমি কি অনুভব কর; তোমার সেই অনুভূতির ওপরে ভিত্তি করেই তারা তোমাকে সাড়া দেবে। যদি তুমি পাশে বসা মানুষটিকে জীবন্ত মনে কর, তুমি সাড়া দেবে প্রেম বা উপেক্ষা সহকারে অথবা অন্য কোন ভাবে। পাশে বসা কুকুরটিকে তুমি অন্য কোনভাবে সাড়া দেবে। কিন্তু যদি তুমি একইভাবে গাছকে সাড়া না দাও, তার অর্থ তুমি অনুভব কর না যে গাছেরা জীবন্ত। এই যুক্তিটিকে শ্রবণ কর; তুমি সিদ্ধান্তটি বুঝতে পারবে। আমরা কেন ভাবি যে উন্নিদ অত্তা জীবন্ত নয়, মানুষটি আরও বেশী জীবন্ত, কুকুরটি একটু কম জীবন্ত? কেন? কারণ, আমাদের একটি ভুল অর্গতি আছে - কার্য জীবন নির্ণয় করে। অস্তিত্ব জীবন নির্ণয় করে, কার্য নয়। ৫২ যেহেতু মানুষ কুকুরের চেয়ে বেশী কার্য করতে পারে, কুকুর গাছের চেয়ে বেশী কার্য করতে পারে, তুমি কার্যের ভিত্তিতে জীবনের অস্তিত্বকে মাপ। এটাই মৌলিক ভুল। এই প্রকার মৌলিক ভুলগুলি একমাত্র উপনিষদসমূহ দ্বারা মেরামত করা যায়, কেবল উপনিষদসমূহ! কারণ, কেবল উপনিষদের ধ্বনিদের সেই প্রকার অন্তর-আকাশ আছে। তোমার পাশে বসা কুকুরকে দেখে তুমি যদি বিচার কর যে তার খুবই নিম্ন জীবন, তাহলে তুমি হয়ত সাড়াই দেবে না এবং সেই কুকুরটিও সাড়া দেবে না। যদি কুকুরটির অস্তিত্বকে স্বীকার কর, সে নিজেকে ভালবাসবে ও তোমাকেও ভালবাসবে। যে তোমায় নিজেকে ভালবাসতে শেখায়, তুমি তাকে প্রেম কর। এটাই জীবনের নিয়ম। তোমার মনোভাব ভিন্ন হতে পারে : শ্রদ্ধাশীল, কখন সন্ত্রম, কখন ভয়; কিন্তু যে তোমাকে তোমার নিজের সাথে প্রেম করায়, তুমি তাকে প্রেম করবে। আমার সমস্ত কাজ হল মানুষকে নিজের সাথে প্রকৃত প্রেম করানো। আমি অবিরত জীবন হিসেবে তোমার অস্তিত্বকে সম্মান করছি। যেভাবে আমি তোমার অস্তিত্বকে সাড়া দিই, একইভাবে আমি গাছপালার অস্তিত্বে সাড়া দিই। গাছপালার নিজের স্বার্থে শোষণ করার প্রবৃত্তি নেই এবং যা কিছু তারা নেয়, তা তারা তাদের অংশ হিসাবে পেতে চায় না। কিন্তু মানুষ যা তাদের অংশ নয় তাকে নিজের অংশ হিসাবে আত্মভূত করে। তাই যে মুহূর্তে আমি সেই অংশকে আলা দ করি এবং দেখাই - তুমি কি - তুমি আমার সাথে প্রেম করে ফেলবে! মহাদেব-উপাদান, যা তোমার ইচ্ছা পূরণ করে, যা তোমাকে নিজের সম্বন্ধে খুবই সুন্দর অনুভূতি প্রদান করে, তা হল প্রকৃত তুমি। তোমাদের সবার মধ্যে মহাদেব-উপাদান আছে, যা তোমায় নিজের সম্বন্ধে এত সুন্দর অনুভূতি প্রদান করে। কখন কখন লোকেরা বলে যে সেই উপাদান তারা কখনও দেখে নি বা তাদের মধ্যে নেই অথবা তারা এখানে আসার পরে কেউ তা চুরি করেছে। শ্রবণ কর। কেউ তা কেটে ফেলতে পারে না, তাকে কেউ দগ্ধ করতে পারে না বা তোমার থেকে নিয়ে নিতে পারে না! আমাদের সবার মধ্যে মহাদেব-উপাদান আছে। তুমি যতই অস্বীকার কর না কেন, তুমি তার ঝলক নিশ্চয়ই পাও, তুমি তা অভিজ্ঞতা করেছই করেছ। যেই মুহূর্তে আমি তোমাকে জীবনমুক্ত সত্তা, শিব-গণ, মহাদেবের প্রতিমূর্তি হিসাবে সম্মান করি, তুমিও নিজেকে শ্রদ্ধা করা শুরু কর। যখন তুমি জানতে পার তোমার মধ্যে মহাদেব-উপাদান এখনও সক্রিয়, জীবন্ত ও তার মেয়াদ শেষ হয় নি, তখন তুমি তোমার সাথে প্রেমে পড়! নিজের সাথে প্রেমে পড়া হল নিত্যোৎসাহ (নিত্য উৎসাহ) বা চিরন্তন উদ্দীপনার একমাত্র উপায়। আর কিছু তোমাকে চিরন্তন উদ্দীপনা দিতে পারে না। তোমার মহাদেব-উপাদানের সাথে প্রেমে পড়, সেই উপাদান তো চিরন্তন উদ্দীপনা, অনুপ্রেরণা, নিত্যোৎসাহ। যে ব্যক্তি তার নিজের ভিতরে চিরন্তন উৎসাহকে স্পর্শ করেছে, একমাত্র তারই যুক্তির ঊর্ধ্বে সহিষ্ণু হয়ে থাকে। তোমার মধ্যে অযৌক্তিক সহিষ্ণুতা ও যুক্তির ঊর্ধ্বে সহিষ্ণুতা তখনই ঘটবে যখন তুমি তোমার মহাদেব-উপাদান, ঈশ্বরের অংশকে উপলব্ধি কর; কারণ তুমি তো তখন অস্তিত্বের সাথে প্রেমে আছ। তুমি তো সেই অস্তিত্বের সাথে সমাধিতে আছ। তোমার সেই মহাদেব-উপাদানের সাথে প্রেমে থাকা হল ভক্তি। যখনই তুমি শুষ্ক অনুভব কর, সেই উপাদানটিকে আবার আঁকড়ে ধর। তা তোমার মধ্যে অসাধারণ সহিষ্ণুতা নিয়ে আসবে যা সমস্ত যুক্তির ঊর্ধ্বে। যে যুক্তির ঊর্ধ্বের সহিষ্ণুতা অর্জন করছে, সে কখনও বিরক্ত হয় না অথবা বিনষ্ট হয় না। এটা জীবনের নিয়ম। যখন তুমি তোমার মহাদেব -উপাদান জান, তুমি তো অস্তিত্বের সাথে প্রেম আছ। তুমি তো তোমার সম্ভাবনাগুলির সাথে প্রেমে আছ। এটা কোন বিভ্রম বা মায়া নয়। এটা তোমাদের সকলের সম্ভাবনা। কেউ তোমার চেতনাকে সরিয়ে ফেলতে পারে না, কেউ তোমার জীবনমুক্তিকে হরণ করতে পারে না। কেউ তোমার উপলব্ধিকে সরিয়ে ফেলতে পারে না - তুমি তো মহাদেব। পরিশ্রান্ত ও বিষণ্ণ হই স্বরণে রাখ, ‘আমি মহাদেব আমার মহাদেব আমাই মালিক। মহাদেবের অভিজ্ঞতায় পৌছানোর জন্য তিনি আমাকে সবদাই স্বরণ করিয়ে দিচ্ছেন ও সহায়তা করছেন।’ এটা বুঝে নাও, চিন্তা করার ও কার্য করার অক্ষমতা কখনও তোমার মহাদেব-অস্তিত্বকে হরণ করে না। তোমার কার্য তোমার মহাদেবত্বকে, তোমার শিবত্বকে, তোমার মহাদেব-উপাদানকে স্পর্শ করে না। কেউ তা বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রকাশ করে, কেউ তা দেহ থেকে প্রকাশ করে। কিন্তু কেউ তা প্রকাশ করে অক্রিয় থেকে জটিলতা সৃষ্টি ক’রে - এটা তোমার বিশ্বাস করা এক বিরাট মিথ্যা! বুঝে নাও, অক্রিয় থাকা তোমার শিবত্বকে কেড়ে নেয় না। উদাহরণস্বরূপ, যদি কিছু না কর, তোমার শিবত্ব চলে যাবে ভেবে উদ্বিগ্ন হবে না। কিন্তু অক্রিয়তা তোমার শিবত্বকে অভিজ্ঞতা করতে দেবে না, শিবত্বকে প্রসারিত ও বিকিরণ করতে দেবে না। যদি তুমি অক্রিয় হও , তুমি তাহলে জটিল করছ। যখন আমি বলি, তোমার কাছে মহাদেবের উপাদান আছে, তার অর্থ তোমার অস্তিত্বের সর্বজ্ঞান, সর্বশক্তি, সদানন্দের সর্বাচ্চ সম্ভাবনা আছে, কারণ সেটাই তো প্রকৃত তুমি। সেই উপাদান নিয়ে জীবনযাপন শুরু কর, সেই উপাদানকে প্রেম করা শুরু কর। এই উপাদানকে তোমার পেশাতে, তোমার কেরিয়ারে, তোমার পরিবারে, তোমার সম্বন্ধতায়, তোমার জীবনে প্রকাশ করা শুরু কর। স্থির কর, কিভাবে মহাদেব প্রতিটি পরিস্থিতিতে সাড়া দেবেন। ‘যদি মহাদেব এই পরিস্থিতিতে হন, তিনি কিভাবে সাড়া দেবেন? আমিও সেইভাবে জীবন যাপন করি!’ সেটাই ধর্ম - তোমার সমস্ত সম্ভাবনা সহকারে আনন্দে থাকা। যদি সেই মহাদেব-উপাদান তোমার মধ্যে না থাকে, তুমি শ্বাস পর্যন্ত নিতে পারবে না! তোমার কল্পনায়, অকল্পনায় প্রজেক্টগুলো সমাপন করতে যত কিছু করতে হয়, তার দশ হাজার ভাগের একভাগও তোমাকে শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য করতে হয় না। শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য তোমার যত সচেতনতা ও অস্তিত্ব আবশ্যক হয়, কেবল তার দশ হাজার ভাগের একভাগ প্রচেষ্টা ও সচেতনতা প্রয়োজন তোমার জীবনের সমস্ত তথাকথিত প্রজেক্টগুলিকে সমাপন করার জন্য। তোমার জীবন আরও অনেক সহজ হয়, যদি তুমি অস্তিত্বমান হও। সবকিছু সম্ভব! সমস্ত সম্ভাবনাগুলিকে বাস্তবায়িত করার জন্য তোমাকে কোন আলাদা পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার প্রয়োজন নেই। তোমার পক্ষে সম্ভব নয় বলে যা কিছু তুমি বিশ্বাস করছিলে, তোমাকে কেবল সেইসব ভুল বিশ্বাসগুলিকে নাকচ করতে হবে। যা কিছু তোমার পক্ষে সম্ভব নয় বলে তুমি ইতিমধ্যে বিশ্বাস করা আরম্ভ করেছ - তা ঠিক আছে। কিন্তু অনেক জিনিষের জন্য, তুমি কোন মীমাংসা কর নি অথবা বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত কর নি যে সেগুলি তোমার পক্ষে সম্ভব নয় - সেইগুলি তোমার পক্ষে সম্ভব! কেবল সেগুলিকে স্মরণ করলে সেগুলি তোমার মধ্যে খুলতে শুরু করবে। তুমি যদি সম্ভাবনা খুলতে শুরু কর, সেগুলি হঠাৎ তোমার জন্য উপলব্ধ হয়ে যাবে। অনেক কিছুর জন্য তুমি দরজা বন্ধ কর নি, সেগুলি তো তোমার কাছে এখনও উপলব্ধ ও খোলা। তোমাকে তোমার সমস্ত সম্ভাবনা সম্পর্কে স্মরণ করানো হল ঐশ্বত জীবন এবং তা একমাত্র উপনিষদসমূহ দ্বারা সম্ভব।