সপ্তম পরিচ্ছেদ বিজ্ঞান, ঈশ্বরিক চেতনার জন্য তোমার সত্তাকে বিশোধন কর
সপ্তম পরিচ্ছেদ বিজ্ঞান, ঈশ্বরিক চেতনার জন্য তোমার সত্তাকে বিশোধন কর
আমাকে তাঁর সাথে মিশে যেতে হবে। তাঁকেই তো আমাকে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং আমাকে তাঁর মধ্যে মিলিয়ে যেতে হবে। তাই তিনিই তো পরম।’ - যদি এই উপলব্ধি, এই অনুভূতির সংযুক্তি তোমার মধ্যে ঘটে, যা সূর্য-চন্দ্র চক্রের আসা যাওয়া দ্বারা পরিবর্তিত হয় না, তাকেই বলে ভক্তি বা ঐশ্বরিক ভাবাবেগ। [আত্মসংশয় থেকে আত্মবৃণা ও পরে আত্মবর্জন হয়। ইংরাজীতে self-doubt, self-hatred, self-denial, স্বামীজী একে বলেন SDHD] আর যদি এরকম ধারণা হয় যে, ‘আমি এখন বন্ধন বা মুক্ত, যাই অনুভব করি না কেন, পরিণামে আমাকে কখনও বন্ধনে রাখা যায় না, কারণ আমি মহাজগতের প্রতিফলন। মহাজগৎ বা প্রতিফলন - কোনটাকেই বন্ধনে রাখা যায় না। সূর্যকে বন্ধনে রাখা যায় না, আবার জলে বা আয়নাতে তার প্রতিফলনকেও বেঁধে ফেলা যায় না। তুমি আয়নাটাকে বেঁধে ফেলতে পার বা জলকে পাত্রে আটকে রাখতে পার, কিন্তু প্রতিফলনকে নয়?’ এই উপলব্ধি যদি তোমার অন্তঃকরণে থাকে, যা সূর্য ও চন্দ্রের সাথে যাওয়া আসা করে না, উপরে নীচে হয় না, তাহলে সেটাকে বলে বিজ্ঞান, চৈতন্য, ঐশ্বরিক চেতনা, মহাজাগতিক চেতনা। কিছু গ্রন্থ তোমার মধ্যে জ্ঞান জাগরিত করতে পারে, কিছু গ্রন্থ তোমার মধ্যে ভক্তি জাগরিত করতে পারে; কিন্তু একমাত্র উপনিষদসমূহ জ্ঞান-ভক্তি-বিজ্ঞান তিনটিই তোমার মধ্যে জাগ্রত করতে পারে। উপনিষদসমূহ, কেবল উপনিষসমূহের তোমার মধ্যে এই তিনটিই জাগরিত করার সামর্থ্য আছে। এটা গঙ্গামাতা ও সরস্বতীমাতার উপহার। সরস্বতী ও গঙ্গা উপত্যকায় সেই সভ্যতা ঘটে; তাদের যুদ্ধ করার বা আত্মরক্ষা করার প্রয়োজন ছিল না, সেই সভ্যতার কোন শক্ত্রতা অথবা দখল করার প্রবণতা ছিল না, সেই সভ্যতা বহির্জগৎ ও বহির্জগতের সুখের জন্য বিব্রত ছিল না। আমাদের পূর্বপুরুষেরা বহির্জগৎ সম্পর্কে অবিদিত ছিলেন না, তারা বহির্জগৎ নিয়ে বিব্রত হন নি! সেই মহান সভ্যতায়, যেখানে সমস্ত প্রয়োজনীয়তা পূরণ ক'রে স্বাভাবিকভাবে বিরাট শান্তি প্রদান করা হয়েছিল, সেখানে উপনিষদসমূহ ঘটে। এটা বুঝে নাও, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পরম সম্পদ যা তুমি তোমার জীবনে সংগ্রহ করতে পার, তা হল জ্ঞান - ঐশ্বরিক অবগতি, ভক্তি - ঐশ্বরিক ভাবানুভূতি এবং বিজ্ঞান - ঐশ্বরিক চেতনা। বুঝে নাও, উপনিষদসমূহ অভিজ্ঞতা করার জন্য তোমার যে বোধের প্রয়োজন তা হল উন্মুক্ততা, আর কিছুই নয়। উপনিষদসমূহকে উন্মুক্ত হয়ে গ্রহণ কর, তবেই জ্ঞান-ভক্তি-বিজ্ঞান, তিনটিই তোমার নধ্যে ঘটবে। ॐ পরিচ্ছেদ ৮ অদ্বৈত জীবন, উপনিষদসমূহের সুগন্ধসার অদ্বৈত জীবন যাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় বুদ্ধি -সম্পর্কিত সমস্ত বোধ হল জ্ঞান। অদ্বৈত জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুভূতি -সংযুক্তির সমস্ত শক্তিগুলি হল ভক্তি। অদ্বৈত জীবন যাপনের জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় চেতনাগুলি হল বিজ্ঞান। ৪৫ অদ্বৈত জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত বৌদ্ধিক উপলব্ধি থাকা আবশ্যক। অদ্বৈত জীবন অর্থ সর্ব-শক্তি, সর্ব-জ্ঞান, সদা আনন্দ, সৎচিদানন্দ বিকিরণ করা। সৎচিদানন্দ বা সচ্চিদানন্দ (সৎ - সত্য, চিৎ - জ্ঞান, আনন্দ) হিন্দু মস্তিষ্কের এক অলীক কল্পনা নয়। এটা তারকবন বা নৈমিষারণ্যের আদি ঋষিদের কোন রূপকথা নয়। সৎচিদানন্দ এক বাস্তবতা! উপনিষদসমূহ। উপনিষদসমূহ অদ্বৈত জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিপূর্ণ প্রসারণ। উপনিষদসমূহ যেভাবে জ্ঞান ব্যাখ্যা করে, তা বোঝার জন্য আপনাকে অদ্বৈত জীবন যাপন করতে হবে! এইপ্রকার অতি উৎকৃষ্ট মস্তিষ্কে অলীক কল্পনা অথবা বিভ্রান্তি থাকতে পারে না। যাঁরা এই প্রকার উচ্চস্তরের সত্যসকলকে আয়ত্ব ক ’রে, উপলব্ধি ক’রে কাব্যের মাধ্যমে উপস্থাপিত করতে পারে, কোনভাবেই তুমি তাঁদের অলীক কল্পনা বা বিভ্রান্তি আছে বলে দোষারোপ করতে পার না। সেইজন্য সৎচিদানন্দ বিভ্রান্তি নয়। তা তোমার প্রাতঃ রাশ বা শুভরাত্রির নিদ্রার মতই সত্য। যদি তুমি আমাকে এসে বল যে তুমি প্রাতঃরাশ (ব্রেকফাস্ট) করেছ, আমি তোমাকে মায়া বা বিভ্রান্তিতে আছ বলে অভিযুক্ত করব না। আমি জানি তা এক বাস্তব। কারণ প্রাতঃরাশ সম্ভব, তুমি তা খেতে পার। এটা সহজ ব্যাপার! যদি বল, রাত্রে ভাল ও শান্তিপূর্ণ ঘুম হয়েছে, তখন আমি তোমাকে বিভ্রান্ত হয়ে আছ বলে দোষারোপ করব না। রাত্রে ভাল ঘুম তো এক সহজ সম্ভাবনা! সৎচিদানন্দ - সর্ব-জ্ঞান, সর্ব-শক্তি, সদা-আনন্দ, এমনই এক সহজ সম্ভাবনা। তোমার উচ্চতর সম্ভাবনার বিদ্যমানতাকে অস্বীকার করা খুবই হতাশাজনক। তোমার উচ্চতর সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা হল তোমার ভবিষ্যতকে বর্জন করা! যদি তুমি অস্বীকার কর যে তুমি কখনও ধনী, সুখী, সাচ্ছন্দ্যময় হতে পারবে, তুমি তাহলে তোমার সম্পূর্ণ ভবিষ্যতকে অস্বীকার করছ। একইভাবে তোমার সচ্চিদানন্দের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার অর্থ হল তোমার আধ্যাত্মিক ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করা। সেটা তো আধ্যাত্মিক আত্মহত্যা! কেউ যেন তোমাকে আধ্যাত্মিক আত্মহত্যা করার জন্য জোর না করে। আর অসংখ্য মানুষ আছে যারা তাদের সরাসরি ও পরোক্ষভাবে শিক্ষা ও প্রচার মারফৎ তোমাকে আধ্যাত্মিক আত্মহত্যা করার জন্য জোর করে যাচ্ছে। টিভি, সিনেমা, বই, নানা বিনোদনের শো, প্রচারমাধ্যম (মিডিয়া), ইন্টারনেটের মাধ্যমে লোকেরা অনবরত তোমার ভবিষ্যতের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার জন্য জোর করে চলেছে। শুরু হলেন এই সকল অজ্ঞতার জন্য মৃত্যুর ঘন্টা। শুরু হলেন তোমার আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার জন্য এক শক্তিশালী জেগে ওঠার ডাক। তোমাকে তোমার আধ্যাত্মিক ভবিষ্যতের নিমিত্ত জাগ্রত করা, তোমাকে তোমার আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাতে জাগ্রত করা - তা হল গুরু বা মাস্টারের কাজ! সচ্চিদানন্দ (সৎ, চিৎ, আনন্দ) বিভ্রম, মায়া বা অলীক কল্পনা নয়। সচ্চিদানন্দ সম্ভব, সচ্চিদানন্দে জীবন যাপন করা সম্ভব। অদ্বৈত জীবন সম্পর্কে এটাই আমি প্রথম বিবৃতি হিসাবে দিতে চাই দ্বিতীয় : সেই আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার জন্য যে বোধসমূহ তোমার চাই, তা হল জ্ঞান। তারপর যখন তুমি অদ্বৈত জীবন যাপন শুরু কর, রূপান্তরণের মধ্য দিয়ে যাবার সময় নির্দেশিত কিছু আবেগে-বল তোমার দরকার। ভক্তি, ভাব ও আবেগের প্রবলতাকে অদ্বৈত জীবনে প্রবলভাবে প্রবেশ করার জন্য ব্যবহার করা যায় এবং তবে তুমি উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তরে যেতে পার। বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে এসে মানুষের সন্ন্যাস গ্রহণ করা ঠিক নয়; যারা এরকম করেছে তাদের সন্ন্যাসজীবন কখনও সার্থক হয় নি। তোমার ভাবাবেগ এক বিশুদ্ধ শক্তি যা তোমাকে এক আকাশ থেকে অন্য আকাশে প্রেরিত করতে পারে। যারা সেই ক্ষমতা, সেই শক্তি ব্যবহার ক’রে সন্ন্যাস গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়, একমাত্র তারাই সফল সন্ন্যাসী হয়। বুদ্ধি দিয়ে যারা বিশ্লেষণ করেছিল, তারা কখনও নয়। যদি তুমি অদ্বৈত জীবন যাপন করার জন্য প্রস্তুত হতে পার, সেটা তোমার বিশুদ্ধ ভক্তির ক্ষমতা! সেটা কেবলমাত্র তখনই হবে যখন তুমি তোমার ভাবাবেগের ও ভক্তির শক্তিকে ব্যবহার কর। সেটাই তো জীবন। বুঝে নাও, অদ্বৈতজীবন অভিজ্ঞতা করা নিমিত্ত প্রয়োজনীয় ঐশ্বরিক ভাবাবেগ হল ভক্তি। আর প্রয়োজনীয় ঐশ্বরিক চেতনা অর্থাৎ অদ্বৈতজীবন অভিজ্ঞতা করা নিমিত্ত কোন সংশয় বিনা মৌলিক বোধগুলি হল বিজ্ঞান। আধ্যাত্মিক পুস্তক পাঠ অথবা সৎসঙ্গ শ্রবণ হল আধ্যাত্মিক চেতনা বিকশিত হবার জন্য অনুমতি প্রদান করা। যদি তুমি মাস্টারের মুখনিঃসৃত দশটি কথা শোন, তুমি হয়ত দুটি ধারণা নিয়ে তর্ক করবে, কিন্তু হঠাৎ চার পাঁচটা ধারণা অন্তরে প্রবেশ ক’রে তোমার চেতনাতে মিশে যাবে এবং তোমার অটল বোধশক্তি হয়ে যাবে! এমনকি তখন তুমি সেগুলি সম্বন্ধে প্রশ্ন করাও ভুলে যাবে। তোমার আধ্যাত্মিক চেতনাকে প্রতিদিন উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাওয়া, এবং তাকে তোমার আত্মসংশয়, আত্মঘৃণা ও আত্মবর্জনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া হল সৎসঙ্গের উদ্দেশ্য। উপনিষদসমূহের প্রধান সারগর্ভসার হল তোমাকে জ্ঞান, ভক্তি ও বিজ্ঞান প্রদান করে অদ্বৈতজীবন যাপনে সহায়তা করা। সত্যসকল, ঐশ্বরিক ভাবাবেগ, ঐশ্বরিক চেতনা - এই উপলব্ধিগুলিকে তোমার সত্তায় নিয়ে আসা হল অদ্বৈতজীবন।