Upanishad SamuhChapter 6 of 11
Chapter 6

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ একমাত্র উপনিষদসমূহই অবতার সৃষ্টি করে

1 sections

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ একমাত্র উপনিষদসমূহই অবতার সৃষ্টি করে

পরেও তুমি কখনও শংকরাচার্যের অনুগামী হবে না; তুমি কেবল শংকরাচার্যের একটি প্রকাশ হবে। তাই শৈবদের একটি সুন্দর শব্দ আছে - শিবগণ, যারা শিবের ভাবমূর্তি। তুমি অবিরত শিবোহম্ চেতনাতে থেকে শিবোহম্ বিকিরণ করতে থাক, তুমি শিবের অনুগামী হবে না, তুমি শিবের মূর্তপ্রকাশ, শিবগণে হয়ে যাবে। গণ অর্থ, যে ভাবনার বাস্তবরূপ প্রদান করে, যে পরিপূর্ণ। তাই উপনিষদের ওপরে মতভেদ ও ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য যেন তোমাকে উপনিষদ থেকে দূরে না সরিয়ে নেয়, বরং এজন্য তোমার মূল উপনিষদসমূহ পাঠ করার জন্য অনুপ্রাণিত হওয়া উচিত। আমাদের হযর হাজার হাজার মতামত ও ধারণা আছে, কিন্তু কেউই উপনিষদসমূহের সাধুতাকে, তাদের প্রামাণিকতাকে, তাদের কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করে না। সেখানেই সবাই একত্র হয়, একসাথে হয়। প্রতিটি বিজ্ঞানীর হযর নানা অভিমত, বিভিন্ন তত্ত্ব ও গবেষণাসমূহক মতামত আছে, কিন্তু তারা সবাই বিজ্ঞানের আত্মাকে স্বীকার করে চলে। একইভাবে, প্রত্যেক মাস্টারের হযর আলাদা ধারণা, ভিন্ন তত্ত্ব ও নীতি আছে, কিন্তু তাঁরা সকলে উপনিষদসমূহের আত্মাকে স্বীকার করেন। উপনিষদসমূহকে যত বেশী পাঠ করবে, বারবার পড়বে, বুঝবে ও আত্মভূত করবে, ততই তুমি অন্তর থেকে সুন্দর হবে; ততই তা তোমার অন্তর্দেশকে সুন্দর করবে। প্রতিটি সত্য যা তোমাকে মহাজাগতিক চেতনাতে পৌঁছে দেয়, তা মহাজগৎকে তোমার চেতনাতে টেনে আনে। ব্রক্ষাওকে পিণ্ডাওে প্রবেশ করতে হবে এবং পিণ্ডাওকে প্রবেশ করতে হবে ব্রক্ষাওে। ব্রক্ষাও (macrocosm) হল নিখিল জগৎ, আর পিণ্ডাও (microcosm) হল ক্ষুদ্র জগৎ, মানুষ। ব্রক্ষাওকে পিণ্ডাওের অংশ হতে হবে, আর পিণ্ডাওকে ব্রক্ষাওের অংশ হয়ে যেতে হবে। কেবল বিন্দু মহাসাগরে মিলিয়ে গেলে হবে না, মহাসাগরকে বিন্দুতে মিশে যেতে হবে। বিন্দুর মহাসাগরে মিশে যাওয়া হল জীবনমুক্তি (Enlightenment)। যখন মহাসাগর বিন্দুতে মিশে যায়, তিনি এক অবতার (Incarnation)। উপনিষদসমূহ বারবার, বারংবার পাঠ কর, তোমার অন্তর্দেশ সুন্দর হবে। একবার পাঠ করলে ও বুঝতে পারলে, তুমি সেই ধারণাতে মিশে যাও। কিন্তু বারংবার পাঠ ক'রলে সেই ধারণা তোমার মধ্যে মিশে যায়। কেবল যখন ধারণা তোমার মধ্যে মিশে যায়, তুমি সুরক্ষিত হও যে তুমি তা ভুলে যাবে না, তা তোমার জীবনে হারিয়ে যাবে না; তা তোমার অংশ হয়ে যাবে। পিপাসিতের বৃক্ষাতেও যাওয়া হল জীবনমুক্তি। বৃক্ষাত্ত্ব পিপাসিত হলেই তা হয় অবতারাী। তোমার মহাজাগতিক চেতন্য হয়েছে এবং মহাজগতের চেতন্যে তুমি আছ। তোমার মহান সত্যসকলে মিশে যাওয়া এবং মহান সত্যসকলের তোমাতে মিশে যাওয়া; দুটো পুরোপুরি ভিন্ন। উপনিষদসমূহ সহকারে মহান সত্যগুলি তোমাকে কেবল সেগুলিতে দ্রবীভূত হতে উদ্দীপ্ত করবে, তা নয়, এমনকি সেগুলিও তোমার মধ্যে দ্রবীভূত হয়ে যাবে। যে কোন ধর্মগ্রন্থ অথবা মহাপুরুষ লিখিত কিছু শ্লোকের পাঠ তোমার সত্তাকে সত্যসকলে মিশে যাবার জন্য উদ্দীপ্ত করতে পারে। সেটাকে বৈদিক প্রথার মহান ভক্ত বৃন্দ ও সাধুগণ, মীরা, জ্ঞানসম্বন্দর, মাণিক্কবাসাগর, রামদাস, চৈতন্য মহাপ্রভু, এনারা বলেন 'ভক্তি'। তাঁরা সবাই মহাজগতের সাথে মিশে যাবার জন্য ভাব ও আবেগের প্রবলতাকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করেন। তোমাকে সত্যে মিশে যাবার জন্য উদ্দীপ্ত করতে যে কোন ধর্মগ্রন্থই পারে; কিন্তু মহাজগতকে তোমার মধ্যে মিশে যাবার জন্য অধীর করতে কেবল উপনিষদসমূহই পারে। কেবল উপনষসমূহ তোমাকে সেই উচ্চতায় উখিত করতে পারে - তুমি এত বিস্তীর্ণ হয়ে যাও যে মহাজগৎ তোমার মধ্যে মিশে যায়। পীঠস্থ এত বড় হয়ে যায় যে তাতে বৃক্ষাঙ্ক তাতে দ্বিভূত হয়ে যেতে পারে। পুরো বৃক্ষাঙ্ককে তোমার মুখের মধ্যে পাওয়ার জন্য, তোমার মুখটিকে সম্পূর্ণ বৃক্ষাঙ্কের আকারে হয়ে খুলতে হবে। সত্যকে তোমার মধ্যে মিশে যাবার জন্য তোমাকে তো সত্যতির থকে দীর্ঘকায় হতে হবে। তা কেবল উপনিষদসমূহ দ্বারা ঘটতে পারে। সেইজন্য উপনিষদসমূহ কেবল জীবনমুক্ত সত্তা বিকশিত করে তা নয়, উপনিষদসমূহ অবতার তৈরি করে। লোকেরা আমায় জিজ্ঞাসা করে, 'কেবলমাত্র ভারতবর্ষে এত অবতার কেন?' এই দেশের বিদ্যা, উপনিষদসমূহই কেবল অবতার নির্মাণ করতে সক্ষম, তাই ভারতে বহু অবতারগণ এসেছিলেন, আছেন ও আসতে থাকবেন! পৃথীগ্রহে যদি অবতারগণকে সম্ভব হতে হয়, তা একমাত্র ভারতেই সম্ভব, কারণ উপনিষদসমূহ সহকারে জীবন যাপন কেবল ভারতেই হয়। কেবল উপনিষদসমূহের জন্য এই দেশ হল সবচেয়ে পবিত্র দেশ। যতদিন উপনিষদসমূহ এই দেশের শ্বাসপ্রশ্বাস হয়ে আছে ও থাকবে, ভারতবর্ষে অবতার ঘটতেই থাকবে। ।। বেদ বেদান্ত সারঃ ।। বেদ বেদান্তের সুগন্ধসার হল উপনিষদসমূহ তোমাকে মহাজগতে নিয়ে যাবার জন্য এর সক্ষমতা, তোমাকে মহাজগতে উত্তোলন করার জন্য এর দক্ষতা, তোমাকে মহাজগতে বিকরণ করানোর জন্য এর নিপুণতা; তা প্রশংসিত, অকল্পনীয়। ॐ পরিচ্ছেদ ৭ বিজ্ঞান, ঐশ্বরিক চেতনার জন্য তোমার সত্তাকে বিশোধন কর সত্তার সত্য সূর্যচন্দ্র চক্র দ্বারা পরিবর্তিত হয় না। কিছু গ্রন্থ তোমার মধ্যে জ্ঞান ও ভক্তি জাগরিত করতে পারে; কিন্তু একমাত্র উপনিষদসমূহ তোমার সত্তায় জ্ঞান-ভক্তি-বিজ্ঞান তিনটি জাগ্রত করতে পারে। উপনিষদসমূহ সুবিশাল! এর পাঠ ও উপলব্ধি দ্বারা বিশোধিত হয় ঐশ্বরিক বুদ্ধি, ঐশ্বরিক ভাবানুভূতি ও তোমার অস্তিত্বের শুদ্ধতা। কিছু গ্রন্থ তোমার বুদ্ধিকে পরিশোধিত করে , কিছু গ্রন্থ তোমার ঐশ্বরিক ভাবাবেগ বিশোধিত করতে পারে, কিন্তু একমাত্র উপনিষদসমূহ তোমার বুদ্ধি, ভাবাবেগ ও তোমার বিশুদ্ধ অস্তিত্বকে (সতা, beingness) পরিশোধন করতে পারে। তোমার বিশুদ্ধ অস্তিত্ব অর্থ, মুক্তিকে ভবিষ্যৎ-বর্তমান-অতীতে তোমার বিদ্যমানতা হিসাবে অভিজ্ঞতা করা; মুক্তিকে তোমার ভবিষ্যৎ-বর্তমান-অতীত হিসাবে অভিজ্ঞতা করা। তোমার সত্তাকে শোধন করলে পুত বুদ্ধি তোমার সত্তার অংশ হয়ে যায় এবং তা তোমার সত্তায় চেতনা হয়ে থেকে যায়; এটা তো এক শক্তিশালী অস্তিত্ব-সম্বন্ধীয় ও অভিজ্ঞতামূলক সত্য। উদাহরণস্বরূপ, যদি তোমার ‘তুমি’ সম্পর্কে একটি দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে তুমি এক আশীর্বাদপুষ্ট সত্তা, ঈশ্বর তোমার সহায়তা করছেন ও তিনি অবিরাম তোমার যত্ন করছেন; তুমি তার কাছে প্রার্থনা করলে তিনি তোমার সহায়তা করেন - সেটা তোমার নিজের সম্পর্কে তোমার খুব সুন্দর সূক্ষ্ম ও পবিত্র অভিজ্ঞতাগুলির মধ্যে একটি। একইভাবে যদি তোমার সেই অনুভূতির সংযুক্তি থাকে, ‘যখনই আমি ঈশ্বর বা গুরুকে ডাকি, সাথে সাথে তিনি আমায় সাড়া দেন, তিনি আমার কাছে উপলব্ধ হন,’ যদি এটা তোমার অংশবিশেষ হয়, তাহলে এটা বিশ্বাস (faith or belief) নয়। এগুলি বিশ্বাস, ফেইথ বা বিলিফ, নয়। এগুলি আরও গভীর, তোমার অবহিত হওয়া চারপাশের তথাকথিত বাস্তবতার চেয়ে বাস্তব। যদি তুমি অনুভব কর - যেই মুহূর্তে তুমি তোমার ইষ্ট দেবতা বা গুরুকে ডাক, তিনি সাথে সাথে সাড়া দেন, তিনি তোমার সাথে থাকেন - সেটা সূক্ষ্মতম বিশুদ্ধ ভাবাবেগ। আবার 'পরিণামে আমি জানি আমি জীবনমুক্ত হব এবং মহাজগতে আনন্দে থাকব। জন্মমৃত্যুচক্রের দুঃখভোগের কোন প্রশ্নই ওঠে না' - কখনও কখনও এটাকে মানুষ তার মধ্যে খুব গভীরভাবে অনুভব করে। এটা বিশ্বাস বা ফেইথ নয়, তা স্বচ্ছভাবে বুঝে নাও। বিশ্বাস সূর্য-চন্দ্র চক্রের সাথে আসে আর যায়। যা কিছু সূর্য-চন্দ্র চক্রের সাথে উদিত হয় ও অস্ত যায়, তা বিশ্বাস। যদি পূর্ণিমাতে অনুভব কর সবকিছু ভাল চলছে, আর আমাবস্যায় দেখ, 'না। জানি না। এখন হচ্ছেটা কি?', তাহলে সেটা বিশ্বাস। সূর্য-চন্দ্রের চক্রের সাথে যা আসে আর যায় তা হল বিশ্বাস। কিন্তু কখন কখন আসা-যাওয়ার বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে কিছু উপলব্ধি তোমার জৈব-স্মৃতির (Bio-memory) অংশ হয়ে যায়; তা সেখানে সদাই সকল পরিস্থিতিতে থেকে যায়। কেবল সেগুলি সূক্ষ্ম, শুদ্ধ ভাবাবেগ, বুদ্ধি এবং সত্তার সত্য। ঐশ্বরিক ভাবাবেগ, সত্তার সত্য এবং পৃত বুদ্ধি, আসা-যাওয়ার সূর্য-চন্দ্র চক্রের ওপরে ভিত্তি করে পরিবর্তিত হয় না। যদি তোমার বুদ্ধিগত বোধ থাকে, 'আর যাই হোক এগুলি সব যেখান থেকে এসেছিল সেখানেই মিশে যাবে, ব্যাস'। যদি এই উপলব্ধি সূর্য-চন্দ্রের আসা-যাওয়া দ্বারা পরিবর্তিত না হয়, তাহলে তাকে বলে জ্ঞান। একইভাবে, 'আমার যতই আত্মসংশয়, আত্মঘৃণা, আত্মবর্জন থাকুক, যে উৎস থেকে আমি ঘটেছি তা আমাকে কখনও বর্জন করবে না। তিনিই তো উৎস। আজ বা আগামীকাল