পঞ্চম পরিচ্ছেদ নিজের কাছে মহাজগতের স্পন্দনময় প্রকাশ
পঞ্চম পরিচ্ছেদ নিজের কাছে মহাজগতের স্পন্দনময় প্রকাশ
যেভাবে উপনিষদসমূহ তোমাকে 'তোমার' কাছে উপস্থাপিত করে, যেভাবে তারা বিশ্বকে 'তোমার' কাছে উপস্থাপিত করে, যেভাবে তারা 'তোমার' কাছে ঈশ্বরকে উপস্থাপিত করে, যেভাবে তারা 'তোমার' কাছে জীবনকে উপস্থাপিত করে, তার কোন তুলনাই অন্য কিছুর সাথে হয় না। উপনিষদসমূহ প্রদত্ত বিষয়বস্তুর বিশুদ্ধতা বা তাদের কবিতাশৈলী অথবা কেবল ধ্বনিগুলি যার মধ্যে কুণ্ডলিনী জাগরণের স্পন্দন সুন্দরভাবে নিহিত করা হয়েছে - সবই ঐশ্বরিক অবদান। কেবল ভাষাবিদ্যাগত ও কাব্যিক গুরুত্ব নয়, উপনিষদসমূহের ধ্বনিগত গুরুত্বও প্রচুর। ধর্মের ইতিহাসবেত্তারা উপনিষদসমূহকে হিন্দুধর্মে শ্রেণীভুক্ত ক'রে হিন্দুধর্মের প্রতি অনেক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছে। অবশ্যই হিন্দুরা এর উত্তরাধিকারী কিন্তু হিন্দুদের উপনিষদ অনুযায়ী জীবনযাপন করা উচিত ও সমগ্র বিশ্বের সাথে শেয়ার করা উচিত। আমরা এর উত্তরাধিকারী, কিন্তু কেবল আমরা এর অধিকারী নই, সমগ্র বিশ্ববাসীও এর অধিকারী! উপনিষদ অর্থ উপবেশন করা (বসা), ব্যাস। যখন তুমি বস, যখন 'তুমি' উপবেশন কর - আমি তোমার দেহের বসে থাকার কথা বলছি না, আমি বলছি যখন 'তুমি' বসো, সত্য প্রকাশিত হয়। একমাত্র সঠিক প্রসঙ্গ থেকে উপনিষদসমূহের শিক্ষা প্রদান করা উচিত। উপনিষদসমূহ! যখন ঋষিগণ তাঁদের মধ্যে সমাধিতে উপবেশন করলেন, তাঁদের সম্পূর্ণ সত্তা পবিত্র সত্যসকলের সাথে স্পন্দিত, অনুরণিত হতে শুরু করল। মহাজগৎ তাঁদের মধ্যে দিয়ে গাইতে লাগল ও বিকিরণ করতে লাগল। এই অভিব্যক্তিই উপনিষদসমূহ। সেইজন্যই সংস্কৃতে আমাদের 'ঋষি'র সত্তা দিই, মন্ত্রদ্রষ্টা - 'যাঁরা মন্ত্রকে দেখতে পান'; 'যাঁরা মন্ত্র লেখেন বা শোনেন' নয়। তাঁর অর্থ যখন তোমরা অভিজ্ঞতা করছ, তখন ধ্বনিগুলিও চক্ষু দ্বারা অনুভূত হবে। যদি ধ্বনি কান দিয়ে শোনা হয়, তুমি শুনছ। যদি ধ্বনিকে পাঁচটি ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত কর, তবে তুমি অভিজ্ঞতা করছ। তাই ধ্বনি দৃশ্যমান হলে মন্ত্র দেখা যায়। যখন তোমার চক্ষু ধ্বনি অভিজ্ঞতা করে, যে রেখাগুলি তুমি অভিজ্ঞতা কর তাদের বলে 'অক্ষর'। আমাদের ঋষিগণ প্রতিটি ধ্বনি বা শব্দ অভিজ্ঞতা করেছেন। 'অ'; যখন তাঁরা এই ধ্বনি অভিজ্ঞতা করেন, যে রেখার মাধ্যমে তাঁদের চক্ষু সেই ধ্বনি অভিজ্ঞতা করে, সেই রেখা হয়ে যায় অক্ষর। তাঁরা অত্যন্ত বিকশিত ছিলেন, একদম দুশ্চিন্তামুক্ত ছিলেন, বেঁচে থাকার জন্য সমস্ত আবশ্যক বস্ত্রের প্রাচুর্য ছিল এবং তাঁরা এক সুউচ্চ স্তরে বাস করতেন। তা ছিল কতই না সুন্দর! গঙ্গা নদীর জন্য উপনিষদসমূহ সম্ভব হয়। গঙ্গামাতা গাঙ্গেয় উপত্যকাকে কতই না সমৃদ্ধ করেছেন! মৌলিক সমস্ত আবশ্যকতা তিনি পূরণ করেছেন। সৌভাগ্যবশত, কোন যুদ্ধ হয় নি এবং বেঁচে থাকার জন্য ঋষিদের লড়াই করার কোন প্রয়োজন ছিল না। সকল প্রাকৃতিক শক্তিগুলি সহায় ক ছিল, যাবতীয় প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা হয়েছিল। সেই পরিবেশ, সেই আকাশ তাঁদের জন্য এক চমৎকার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল উপবেশন করার - নিজের সাথে, ব্রক্ষ্মাণ্ডের সাথে, প্রকৃতির সাথে। অস্তিত্ব নিজের সম্বন্ধে তাঁদের মাধ্যমে গান গাওয়া আরম্ভ করেছিল। প্রতিটি উপনিষদের প্রেক্ষাপটের বিন্যাস আলাদা, কিন্তু তাদের দ্বারা বিকিরিত সত্যসকল কট সুন্দরভাবে সমলয়ে আছে। একটি ব্রহ্মাণ্ডের সত্য অনাবৃত করছে , একটি মানুষের সত্য প্রকাশিত করছে, আরেকটি মৃত্যুর সত্যের রহস্যভেদ করছে, অন্যটি জীবন সম্পর্কে সত্য অভিব্যক্ত করছে। যেন তোমার সমস্ত প্রশ্নগুলিকে মুছে ফেলা হচ্ছে এবং তুমি আছ মহাজগতের চেতনায়, আর সম্পূর্ণ মহাজগৎ আছে তোমার চেতনাতে। মহাজাগতিক চেতনা! যখন তোমার চেতনায় মহাজগৎ আছে, তুমি মহাজগতের চেতনায় থাক। মহাজাগতিক চৈতন্য! মানুষকে মহাজাগতিক চেতনায় নিয়ে আসার জন্য যা কিছু বোধ প্রয়োজন , তা সবই সুন্দরভাবে প্রকাশিত ও পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য সমস্ত সন্দেহের উত্তর দেওয়া হয়েছে। তাই উপনিষসমূহে সমগ্র বিশ্বের অধিকার আছে। এগুলি আমাদের কাছে থাকলেও তা প্রকৃতপক্ষে সারা বিশ্বের। আম রা উপনিষদসমূহের উত্তরাধিকারী হতে পারি, কিন্তু তার মালিকানা সমগ্র বিশ্বের। যারাই মায়া ও বিভ্রমে কষ্ট পাচ্ছে, তাদেরকে উপনিষদ প্রদান করা উচিত, তাদের সাথে আমাদের উপনিষদ শেয়ার করা উচিত। উপনিষদসমূহের প্রতিটি ধ্বনি, প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি পংক্তি এক শক্তিশালী চেতনা সহকারে স্পন্দমান। শক্তিশালী চেতনা! এখনও উপনিষদসমূহ ভারতবর্ষকে সজীব রেখেছে। উপনিষদসমূহই ভারতের মেরুদণ্ড, ভারতের ধারণা। আমাদের সমস্ত আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা ও উপলব্ধিগুলি একসাথে হল উপনিষদসমূহ। উপনিষদসমূহ হল কটি কটি মানুষের লাখ লাখ বছরের আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মূর্তপ্রকাশ। উপনিষদসমূহের ভাষ্য, টীকা বা সম্পাদনা (editing) সম্ভব নয় উপনিষদে অনুক্ত বা অপ্রকাশিত কিছুই নেই; তাতে একটা শব্দও অনাবশ্যক নয়। তুমি তাদের সম্পাদনা (এডিটিং) করতে পার না, আবার তার ওপরে টীকা বা ভাষ্যও লিখতে পার না। ভাষ্য অর্থ কিছু জিনিষ অকথিত থেকে গেছে; তোমাকে তার ব্যাখ্যা করতে হবে। এডিটিং মানে অতিরিক্ত বা অনাবশ্যক কিছু শনাক্ত করা। এডিটিং সম্ভব নয়, আবার তার কোন অনুমতিও নেই। ভাষ্য করার অনুমতি আছে, কিন্তু কার্যকরীভাবে সম্ভব নয়, কারণ অবাখ্যত কিছুই সেখানে নেই। সমস্ত ভাষ্য, তা সে শংকরাচার্য হোন কি রামানুজ বা মাধবাচার্য হোন, সবই একই ধারণাগুলির পুনরাবৃত্তি, তাঁরা কেবল পছন্দের ধারণাগুলিকে সবার দৃষ্টিতে নিয়ে এসেছেন, হাইলাইট করেছেন। হাইলাইট করা হয়ত সম্ভব, কিন্তু ভাষ্য করা নয়; কারণ উপনিষদসমূহে অব্যক্ত কিছুই নেই। উপনিষদের ভাষ্য করা সম্ভব নয়। ধর্ম অনুযায়ী তার অনুমতি আছে, কিন্তু সম্ভব নয়। এডিটিং (সম্পাদনা) সম্ভব নয় এবং তার অনুমতিও নেই। সমস্ত আচার্য্যেরা (আধ্যাত্মিক শিক্ষক), এমনকি যারা হিন্দুধর্ম স্বীকার করে না, তারাও ‘এডিটিং করা হবে না’ এই মৌলিক নৈতিকতা স্বীকার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, রামানুজাচার্য্য উপনিষদের কিছু অনুচ্ছেদ হয়ত স্বীকার করেন নি, কিন্তু তিনি কোন এডিটিং করেন নি। একইভাবে চার্বাক, এক বস্তুবাদী, কিছু শ্লোক হয়ত গ্রহণ করতে পারে নি, কিন্তু কোথাও এডিট করেন নি। এমনকি বৌদ্ধরাও একটি উপনিষদ স্বীকার করে - মহানির্ৱাণ উপনিষদ - কিন্তু অন্যান্যগুলিকে স্বীকার করে না, এমনকি তারাও কখন কোন এডিটিং করে নি। তোমরা দেখতে পাবে, যে কোন বৌদ্ধ বিহার বা বিশ্ববিদ্যালয়ে তালপত্রগুলি হিন্দু মঠের মতই শ্রদ্ধা সহকারে রাখা আছে। আদি লেখনে কোন প্রকার বিভ্রান্তির অবকাশ নেই; কোন এডিটিং নেই, নিজ উদ্দেশ্য সাধনের কোন ব্যাপার নেই, কোন বিকৃতি নেই। একইভাবে যদি শংকরমঠের (হিন্দুদের) বৌদ্ধসূত্র সম্বলিত তালপত্রের সংরক্ষণাগারে গিয়ে দেখ, সেগুলিকে পূরোপুরি সত্য অবলম্বন ক’রে সংরক্ষিত দেখতে পাবে। তারা হযত বৌদ্ধধর্ম স্বীকার করে না, কিন্তু কেউ নিজের উদ্দেশ্যসাধনের জন্য হস্তক্ষেপ ক’রে তাতে কোন শব্দ প্রবেশ করানো বা মুছে দেওয়ার সাহস করবে না। এই মহান ভারতীয় সংস্কৃতি, জীবনশৈলী ও প্রথাতে তুমি যে সমস্ত পুস্তক স্বীকার কর না, তুমি তাদের পরিবর্তন, এডিট অথবা বিকৃত কর না। কি সুন্দর সততা ও সাধুতা! কল্পনাতীত সাধুতা এবং বাণী (বাক্) বা মাতা সরস্বতীর প্রতি শ্রদ্ধা! সরস্বতী হলেন পবিত্র কণ্ঠস্বরের দেবী (বাক্দেবী, বাগ্দেবী)। বৈদিক প্রথার, হিন্দু প্রথার ও ভারতবর্ষের জীবনরেখা এই উপনিষদসমূহকে তো কেবলমাত্র স্মরণ করেও মহানন্দ পাওয়া যায়। মহাজাগতিক চৈতন্য! যখন তোমার চেতনায় মহাজগৎ থাকে, তখন মহাজগতের চেতনাতে তুমি থাক। ॐ পরিচ্ছেদ ৬ একমাত্র উপনিষদসমূহই অবতার সৃষ্টি করে যে কোন আধ্যাত্মিক পুস্তক তোমাকে সত্যে নিমজ্জিত হবার জন্য উদ্দীপনা দিতে পারে; কিন্তু মহাজগৎকে তোমার মধ্যে নিমজ্জিত হবার উদ্দীপনা কেবল উপনিষদসমূহই দিতে পারে। তাই অবতার ঘটে ভারতে যে পবিত্র দেশের শ্বাসপ্রশ্বাসই হল উপনিষদসমূহ। যখন তুমি ভয় অনুভব কর, কোন কিছুর দ্বারা আতঙ্কিত হও, সেই উত্তেজনায় তুমি সেই পরিস্থিতিকে নিজের প্রচেষ্টায় পরিবর্তিত করার প্রয়াস কর ; তা হল যোগ। আর তুমি সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করার চেষ্টা কর ও সেই বুদ্ধিকে হস্তক্ষেপ করে তোমাকে রক্ষা করতে অনুরোধ কর , সেটা হল ভক্তি। কখনও তোমার হানি করা যায় না, এটা জেনে প্রকৃত ঐশ্বত-আকাশে অবস্থান করা, স্বতঃচলভাবে তথাকথিত সমস্ত ভয় ও আতঙ্ক মুছে ফেলা হল ঐশ্বত জীবন। উপনিষদসমূহ ঐশ্বত জীবন অভিব্যক্ত করে। উপনিষদের নানা ব্যাখ্যা উপনিষদসমূহের পবিত্রতা ও মৌলিকত্ব সরিয়ে ফেলে না। কখনও কখনও মানুষেরা হিন্দুধর্মের মধ্যে লড়াই এবং মতভেদের সম্বন্ধে প্রশ্ন করে, 'এমনকি শংকরাচার্য, রামানুজাচার্য, মাধবাচার্যের মত মাষ্টারদের মধ্যেও অনেক মতভেদ ছিল। সর্বোচ্চ স্তরের আচার্যরা পরস্পরের সাথে সমমলয়ে নেই। তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ কিভাবে কিছু বুঝতে পারব? কোনটাকে সঠিক ব'লে স্বীকার করব?' এক বৈজ্ঞানিক কিছু আবিষ্কার করে এবং সে নোবেল পুরস্কার পায়। কয়েক বছরের মধ্যে আরেকজন বৈজ্ঞানিক আগের বৈজ্ঞানিককে খণ্ডন করে এবং সে ও নোবেল পুরস্কার পায়। তার অর্থ এই নয় যে তাদের মধ্যে মতভেদ আছে। সত্যকে এখন অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকাশিত করা হল। তার অর্থ এই নয় যে প্রথম বিজ্ঞানীর আবিষ্কার ভুল ছিল। প্রকৃতপক্ষে প্রথম আবিষ্কারের জন্য, আর যেভাবে প্রথম বিজ্ঞানী আমাদের উখিত করেছিল, সেজন্য দ্বিতীয় আবিষ্কার সম্ভব হল। জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতামত অর্থ নানা চিন্তাধারা এবং একাধিক পছন্দ। অবাক করা স্বাধীনতা! অবাক করা সম্ভাবনা! সকলে নিজের মত ক'রে থেঁজে, নিজের মত ক'রে প্রকাশ করে। আর তুমি শংকরাচার্য পাঠ ও আত্মভূত করার