চতুর্থ পরিচ্ছেদ প্রথম ও প্রধানতম পবিত্র গ্রন্থাবলী
চতুর্থ পরিচ্ছেদ প্রথম ও প্রধানতম পবিত্র গ্রন্থাবলী
পৃথ্বীগ্রহে বৈদিক প্রথা হল সর্বপ্রথম ও প্রধানতম আধ্যাত্মিক প্রথা। একইভাবে উপনিষদসমূহ হল বৈ দিক প্রথার সর্বপ্রথম ও প্রধানতম গ্রন্থাবলী। উপনিষদ হল সমস্ত আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা, সমস্ত আধ্যাত্মিক চিন্তাশ্রোতের উৎস। বৈদিক প্রথায় আমরা মুক্ত চিন্তার জন্য ছয়টি উপায় গঠন করেছি। মুক্ত চিন্তা অর্থ , এমন এক চিন্তাশৈলী যা আমাদের সর্বদা সক্রিয়, উৎসাহী, প্রফুল্ল, নিজেকে নবতেজোদীপ্ত, স্বভাবত বুদ্ধিমত্তাশীল, জীবনের নিয়মের সাথে স্বাভাবিকভাবে সারিবদ্ধ এবং প্রকৃতগতভাবে আনন্দিত করে রাখে। তোমার আদি প্রকৃতি অনুযায়ী তুমি তো আনন্দময় , বুদ্ধিমতাশীল, সচেতন ও সজাগ। তোমাকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে তুমি সর্বাধিক সম্ভা বনা ও সর্বোচ্চ অস্তিতু অভিজ্ঞতা করতে পার। যে চিন্তাধারা তোমার সর্বাধিক সম্ভাবনাকে জাগ্রত করে, যা তোমার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত করে, যা তোমাকে পুরোপুরি সক্রিয় করে, ভরপুর আনন্দ প্রদান করে, সম্পূর্ণরূপে জাগ্রত করে, পূর্ণ সজীব রাখে, সেই চিন্তাধারাকে আমরা মুক্ত চিন্তাধারা বলছি। বৈদিক প্রথা দ্বারা নির্মিত ছয়টি মুক্ত চিন্তাধারা হল - সাংখ্য, যোগ, পূর্ব মীমাংসা, উত্তর মীমাংসা, ন্যায় ও বৈশেষিকা। এগুলি বৈদিক প্রথা সৃষ্ট প্রধান ছয়টি মুক্ত চিন্তাধারা। সাংখ্য : অস্তিত্ব, প্রকৃতি যে নিয়মাবলী দ্বারা কাজ করে ও যেসব নিয়মাবলী দ্বারা তা উৎস ও চেতনার সাথে যুক্ত; সেই নিয়মাবলীকে বোঝা এবং তার সাথে নিজেকে সারিবদ্ধ করা এবং এদের মাধ্যমে মুক্ত চিন্তা করা হল সাংখ্য। যোগ : তুমি যাকে 'তুমি' বলে চিন্তা কর, তোমার দেহ ও মন - এই দুইটিকে অস্তিত্বের সাথে সুর বাঁধা ও সারিবদ্ধ করা, তার মাধ্যমে পরম পূর্ণতা, পরিপূর্ণতা, জ্ঞান, উৎফুল্লতা, সক্রিয়তা, অস্তিত্ব, আনন্দানুভূতি অভিজ্ঞতা করা, এই মুক্ত চিন্তাধারাকে বলা হয় যোগ। পূর্ব মীমাংসা : তোমার কার্যের মাধ্যমে মহাজগতের নানাপ্রকার শক্তির সাথে সারিবদ্ধ হওয়া এবং পরমকে অভিজ্ঞতা করা, জীবনমুক্তি, পরিপূর্ণতা ও পূর্ণত্ব অভিজ্ঞতা করা - এই প্রকার মুক্ত চিন্তাধারার অভিজ্ঞতা হল পূর্ব মীমাংসা (কর্মকাণ্ড)। উত্তর মীমাংসা : কেবল তোমার বুদ্ধিকে জীব-ঈশ্বর-জগৎ, এই তিনের সাথে সারিবদ্ধ করা এবং মুক্ত চিত্তা সহকারে জীবনযাপন করা হল উত্তর মীমাংসা (বেদান্ত)। ন্যায় : যুক্তি দ্বারা কেবল ভাগ করতে করতে, বিশ্লেষণ করতে করতে বোঝা এবং মুক্ত চিন্তা করা হল ন্যায়। বৈশেষিকা : সংযুক্ত করতে করতে, অন্তর্ভুক্ত করতে করতে অভিজ্ঞতা করা ও তার মাধ্যমে মুক্ত চিন্তা করা হল বৈশেষিকা। সাংখ্য, যোগ, পূর্ব মীমাংসা, উত্তর মীমাংসা, ন্যায় ও বৈশেষিকা - বৈদিক প্রথা থেকে আসা এই ছয়টি মুক্ত চিন্তাধারা, মুক্ত চিন্তাশোতের প্রতিটি স্বতন্ত্রভাবে তোমাকে মুক্ত চিন্তার সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য পূর্ণ। যদি তুমি সাংখ্য অভ্যাস কর, তোমার যোগ বা অন্যান্য মুক্তচিন্তাধারা থেকে কোন সাহায্যের প্রয়োজন নেই। তুমি এখন যেখানে আছ সেখান থেকে তোমার যেখানে যাওয়া উচিত, তার জন্য সাংখ্যই যথেষ্ট। তুমি যেখানেই থাক না কেন, তা তোমার কাছে পৌঁছে যাবে এবং তোমার যেখানে যাবার কথা সেখানে নিয়ে যাবে। এটা স্বাধীন, বুদ্ধিসম্পন্ন, যথেষ্ট স্বতন্ত্র চিন্তাধারা, যার মাধ্যমে তুমি মুক্তচিন্তা অভিজ্ঞতা করতে পার। সাংখ্যের স্বতন্ত্র বুদ্ধিমত্তা আছে এবং তুমি যেখানে আছ সেখান থেকে তোমার যেখানে যাওয়ার কথা সেখানে নিয়ে যাবার জন্য সাংখ্য একাই সক্ষম। সাংখ্য অভ্যাস করলে তোমাকে অন্য কোন চিন্তাধারা অভ্যাস করার দরকার নেই। উপনিষদসমূহ, সমস্ত মুক্তচিন্তাধারাগুলি বা দর্শনের উৎস। আমরা মুক্তচিন্তাধারাকে সংস্কৃততে বলি দর্শন, উপলব্ধি করার সামর্থ্য। ‘দর্শন’কে ইংরাজীতে ‘ফিলোসফি’ (philosophy) অনুবাদ করা যায় না। ফিলোসফি খুবই দুর্বল, অপভীর শব্দ। আমি একটা নতুন শব্দ ব্যবহার করব - ফিলোসিয়া (philosia), দেখার এক নতুন সম্পাবনা। বৈদিক প্রথা যে ষড় দর্শন বা ছয়টি ফিলোসোফিয়া নির্মাণ করেছে, তার সব কয়টি উপনিষদসমূহ থেকেই এসেছে। উপনিষদ হল মাতা যিনি ষড় দর্শনের জন্ম দিয়েছেন। প্রতিটি চিন্তাধারা, প্রতিটি মুক্তচিন্তার দ্বারা হাজার হাজার সম্প্রদায়, পরস্পরার জন্ম দিয়েছে, যেগুলির প্রত্যেকটি পাশ্চাত্য অভ্যাস অনুযায়ী একেকটি ধর্ম (religion) শব্দের সমতুল্য। তোমরা পাশ্চাত্য জগতে রিলিজিয়ন (religion) বলতে যা বুঝেছ, সংস্কৃতে তার সমতুল্য শব্দ হল সম্প্রদায় (Order); কারণ সনাতন ধর্ম বা বৈদিক প্রথা হল মূল ছয়টি চিন্তাধারার মাতা এবং তাঁর থেকেই সমস্ত রিলিজিয়নের জন্ম হয়েছে। সেইজন্যই বৈদিক প্রথা বা হিন্দুয়িজম-কে (Hinduism) ‘রিলিজিয়ন’ নামের এক ছোট ফ্রেমে ধরে রাখা যায় না। এটা খুবই ছোট একটি ফ্রেম কারণ প্রতিটি রিলিজিয়ন একটি জীবনশৈলী। বৈদিক প্রথা, উপনিষদের জীবনশৈলী, ছয়টি মুক্ত চিন্তাধারা বা ষড় দর্শনের জন্ম দিয়েছে; আবার ষড় দর্শন থেকে পালাক্রমে অসংখ্য সম্প্রদায়, পরস্পরা, প্রথা ও ধর্মের জন্ম হয়। উপনিষদসমূহ এত বিস্তীর্ণ যে তাদের কোন একটি রিলিজিয়নে রাখা যায় না। সর্বোত্তম সমস্ত চিন্তাধারা , সর্বোত্তম মুক্ত চিন্তাধারার উৎস হল উপনিষদ। অস্তিমান থাকার প্রণালী, নানা বৈচিত্র্যের পছন্দ সহকারে বাস করার পদ্ধতি এবং সম্ভাবনাগুলিকে উপনিষদ অভিব্যক্ত করে। এইরূপ নানা পছন্দ (choice) গভীরতা প্রমাণ করে, বিভ্রান্তি নয়। বেদমাতার মহিমা দেখ! তিনি কি ভাবে মানবতার জন্য দাঁড়িয়েছেন, মানব চৈতন্যের জন্য তাঁর কত অবদান। আজ পৃথিবীতে তোমরা যা কিছু দেখ , যা তুমি কর, উদ্যাপন কর, তা বেদমাতার অবদান। এগুলি তার দেওয়া উপহার। গণিতশাস্ত্র, জ্যোতিষ, জ্যোতিরবিজ্ঞান, শরীরবিদ্যা যে কোন শব্দই তুমি ব্যবহার কর না কেন, সমস্ত চিন্তার স্রোত, চিন্তাধারা, যা কিছু ভাল তুমি দেখ ও শোন, তা বেদমাতা প্রদত্ত উপহার - উপনিষদ থেকে আসা চিন্তাধারার উপহার। উপনিষদসমূহ হল বৈদিক প্রথার সর্বোত্তম গ্রন্থ। বৈদিক প্রথার পবিত্র শাস্ত্রগুলির মধ্যে উপনিষদসমূহকে সর্বোচ্চ শিখরে রাখা হয়েছে এবং তা অ-বিতর্কিত। সকল সম্প্রদায়, ষড় দর্শন - সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিকা, উত্তর মীমাংসা, পূর্ব মীমাংসা - এই ছয়টি মুক্তচিন্তাধারার প্রতিটি উপনিষদসমূহকে চূড়ান্ত, প্রথম ও অগ্রণী গ্রন্থ ব'লে স্বীকার করে। ইতিহাসবেত্তারা উপনিষদসমূহকে একটি রিলিজিয়নের (ধর্মের) ফ্রেমে শ্রেণীভুক্ত করে বিরাট ভুল করেছে। আধুনিক কালে তারা এগুলিকে বৈদিক প্রথাতে ডুবিয়ে তাকে হিন্দুধর্ম বলে বর্ণনা করে। যদি আমরা উপনিষদসমূহকে কোন এক বিশেষ রিলিজিয়নে শ্রেণীভুক্ত করি, তাহলে আমরা উপনিষদসমূহের গরিমা ও সম্ভাবনাকে অশ্রদ্ধা করব। প্রথমত উপনিষদসমূহকে শ্রেণীভুক্ত করা যায় না। যদিবা তাদের শ্রেণীভুক্ত করতে হয়, আমি তাদের শ্রেণীভুক্ত করব এই বলে - সমস্ত মুক্তচিন্তাধারার উৎস, মানুষজাতিকে উচ্চতর স্তরে বিকশিত করাবার উপযোগী সমস্ত জীবনশৈলীর উৎস। যেহেতু উপনিষদসমূহ সকল মুক্তচিন্তাধারার উৎস এবং মানুষকে বিকশিত করে, তাই সুস্পষ্টরূপে উপনিষদসমূহ প্রথম ও অগ্রণী ঐশ্বরিক গ্রন্থাবলী। উপনিষদসমূহ হল, অস্তিত্ব নিজেকে নিজের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে ও উদযাপন করছে, অস্তিত্ব নিজেকে প্রদর্শন করাচ্ছে কিভাবে নিজসত্তা হওয়া যায়। উপনিষদের প্রতিটি শ্লোক একেকটি মুক্তচিন্তাধারার জন্ম দেয় এবং যা পালাক্রমে অসংখ্য মানুষকে মুক্ত করে । উপনিষদসমূহ হল প্রথম ও অগ্রণী ঐশ্বরিক গ্রন্থাবলী যার ও পরে ভিত্তি ক'রে তোমার জীবনশৈলীকে সারিবদ্ধ করা উচিত। উপনিষদসমূহ বারংবার পাঠ ক'রে বুঝে তাদের আত্মভূত ও উপলব্ধি ক'রে তার আদর্শে জীবনযাপন করা উচিত, আমাদের মাধ্যমে তাদের বিকিরণ ক'রে প্রচার করা উচিত ও পূজা করা উচিত। উপনিষদসমূহ হল পবিত্রতম আদি সত্যসকল। ॐ পরিচ্ছেদ ৫ মহাজগতের নিজের কাছে স্পন্দনময় প্রকাশ উপনিষদ অর্থ কেবলমাত্র উপবেশন করা (বসে থাকা)। উপবেশন করলে সত্য প্রকাশিত হয়। যখন ঋষিগণ মন্ত্রদ্রষ্টা হয়ে সমাধিতে উপবেশন করলেন, তখন তাঁদের সত্তায় মহাজাগতিক পবিত্র সত্যসকলের স্পন্দন শুরু হয়। এই অভিব্যক্তি হল উপনিষদসমূহ।