তৃতীয় পরিচ্ছেদ পৃথিবীতে প্রথম ও সবচেয়ে প্রামাণিক গ্রন্থাবলী
তৃতীয় পরিচ্ছেদ পৃথিবীতে প্রথম ও সবচেয়ে প্রামাণিক গ্রন্থাবলী
পরিচ্ছেদ ৩ পৃথিবীতে প্রথম ও সবচেয়ে প্রামাণিক গ্রন্থাবলী উপনিষদসমূহ হল পৃথীগ্রহে লিখিত প্রথম গ্রন্থাবলী। যখন ঋষিরা অন্তর্ধান করেন, অস্তিত্ব মহাজাগতিক সত্যসকলকে অভিব্যক্ত করে। অপৌরষেয়ত্ব বা গ্রন্থকার বিহীনতা এই সত্যসকলের শক্তি প্রমাণ করে ও উপনিষদসমূহকে সর্বাধিক প্রামাণিক শাস্ত্র হিসাবে প্রকাশ করে 13 যে কোন সত্য, ধারণা, ধর্মতত্ত্বে যদি ব্যক্তিবিশেষ উপস্থিত থাকে, তবে তা কেবল সেই ব্যক্তিবিশেষের জন্য বেশী উপযোগী হয়; তা সবার জন্য, মানবতার জন্য, সমাজের জন্য অত উপযোগী নয়। ব্যক্তি যত কম উপস্থিত থাকবে, তত বেশী সত্য, ধারণা, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন সমস্ত মানবতার জন্য, সবার জন্য উপযোগী হবে। ব্যক্তির প্রভাব কেবল সমৃদ্ধকরণের জন্য হওয়া উচিত, কখনও সেই ব্যক্তির পরিচিতিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নয়। যুদ্ধে বিজয়ীরাই সদা ইতিহাস লিখেছে। সেইজন্য কোন ইতিহাস বাস্তব নয়, 'যেভাবে ঘটনাগুলি ঘটেছিল' - তা নয়। যখন কিছু নির্দিষ্ট ভাবাদর্শের ওপরে লেখকের নিজের কায়েমী স্বার্থ, ভয় ও লোভ থাকে না, কেবল তখন ইতিহাস বাস্তব ও পূর্ণ হয় এবং তা সমগ্র বিশ্বের জন্য ও সম্পূর্ণ মানবজাতির জন্য উপযোগী হয়। কোন কায়েমী স্বার্থ বিনা যে ইতিহাস লেখা হয় তাকে বলে পুরাণ। কায়েমী স্বার্থ সহকারে লিখিত ইতিহাসের চেয়ে পুরাণসমূহ অনেক বেশী বাস্তব। যে পুস্তকে লেখক বেশী করে উপস্থিত, সে পুস্তক পড়বে না। যদি গ্রন্থকার তার নিজের ভিতরে অন্তর্হিত হয়ে থাকেন এবং তাঁর কোন কায়েমী স্বার্থ, ভয় বা লোভ থাকে না, তাহলে সেই মানুষটিকেও অধ্যয়ন কর, কেবল তাঁর গ্রন্থই নয়। সেই ব্যক্তির জীবন অধ্যয়ন কর! তাঁর আশেপাশে থাক এবং শেখ, তুমি সত্য জানতে পারবে। যদি গ্রন্থকার তার নাম প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, সেখানে কলুষিতা আছে, কোন কারণ, কায়েমী স্বার্থ, ভয় বা লোভ আছে। কখন কখন লেখকেরা নিজের নাম ব্যবহার না করে কোন জনপ্রিয় নাম ব্যবহার করে, কারণ জনপ্রিয়তার দ্বারা তারা নিজেদের কাজগুলিকে সুরক্ষিত রাখতে চায়। কেবল যখন ব্যক্তি অনুপস্থিত, তার নিজস্ব কায়েমী স্বার্থ, ভয় ও লোভ অদৃশ্য হয়, দ্রবীভূত হয়ে যায়। সে তখন অস্তিত্বের নিজের বিদ্যমানতার গীত প্রকাশিত হওয়ার জন্য এক বিশুদ্ধ চ্যানেল হয়ে যায়। অপৌরষেয়ত্বা। উপনিষদ হল অস্তিত্বের নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে গান! নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে অস্তিত্বের গান! উপনিষদসমূহ এতই অসাধারণ যে কেউ তাতে মালিকানা ঘোষণা করতে পারে না। মানুষ মানবতার শুরু থেকে পৃথিবীগ্রহের চারিদিকে বহু নগর নির্মাণ করেছে। কিন্তু এত কিছু করার পরেও আমরা কি পৃথিবীগ্রহের ওপরে মালকা না দাবি করতে পারি? না! এতে মালিকানা দাবি করা করা এক বিশাল ব্যাপার। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও দুর্যোগগুলি হল বারংবার আমাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া প্রকৃতির ‘লীগাল নোটিস’, যা বলে, ‘কেবল যেহেতু তোমরা এতগুলি নগর নির্মাণ করেছ, তার মালিকানা দাবি করবে না’। উপনিষদে অভিব্যক্ত এই সত্যগুলি খুবই বিশাল। তোমার মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও তুমি তার মালিকানা দাবি করতে পার না। কোন একটি দেশে পৌঁছানোর সমুদ্রপথ আবিষ্কার করার জন্য সেই দেশের ওপরে মালিকানা করা তো এক বোকামি । যেহেতু তুমি আবিষ্কার করেছ যে পৃথিবী গোল, সেজন্য তুমি পৃথিবীর ওপরে মালিকানা দাবি করতে পার না। উপনিষদে অভিব্যক্ত সত্যগুলি খুবই বিস্তীর্ণ, বিশাল! ঋষিগণ উপনিষদের মালিকানা দাবি করেন নি, আবার তাঁরা লেখক হিসাবে তাঁদের নামগুলিও সেখানে রেখে যেতে ইচ্ছাপ্রকাশ করেন নি। সেই কয়েকজন মহাত্মা যাঁরা ব্রক্ষণের স্পন্দনে নিজেদের অনুরণিত করার জন্য উখিত করেছিলেন , তাঁরা তো সেই ব্রক্ষণের সাথে একীভূত হয়ে মিলিয়ে গেছেন! সেভাবে একীভূত হবার পরে তাঁরা যে সকল সত্য পেয়েছিলেন, যে সকল সত্য তাঁরা নিজেদের মধ্য দিয়ে অভিব্যক্ত করতে পেরেছিলেন, তা উপনিষদসমূহ হয়ে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। এই ঋষিগণ বুঝেছিলেন কেবল যখন তাঁরা নিজেরা মিলিয়ে যান, এই সত্যসকল প্রকাশিত হয়। তাই সেই সত্যসকলের মালিকানা না নেওয়ার এবং এমনকি গ্রন্থকার হবার দাবী না করার স্পষ্ট নির্নয় তাঁরা নিয়েছিলেন। যে গোয়ালা জীবিকা নিমিত্ত কয়েকটিমাত্র গরু নিয়ে এক ছোট গোশালা চালায়, যদি সে তার সমস্ত দুধ কোন বিগ্রহের অভিষেকের (পূণ্য স্থান) জন্য দান করে দেয়, সেটা সর্বোত্তম সমর্পণ; কারণ সেই দুধ ছিল তার সম্পূর্ণ জীবনের প্রচেষ্টার ফল। একইভাবে কোন লেখককে পক্ষে তার নাম ও গ্রন্থকারিতা বর্জন করা, নাম উল্লেখ না করা - অপৌরষেয়ত্ব - হল সর্বোত্তম সমর্পণ! যদি তুমি গ্রন্থকার হও, লেখক হও, তবেই এটা বুঝতে পারবে। আর উপনিষদের ঋষিরা এমন সুউচ্চ ধারণা অভিব্যক্ত করার পরেও নিজেদের নাম জানান নি। কোন ভুলিকনাও যদি উপনিষদসমূহ আত্মভূত করে, তা মহাদেব হয়ে উপবেশন করবে, তা মহাদেব হয়ে যাবে! কোন শব উপনিষদসমূহ আত্মভূত করলে, তা হয়ে যাবে শিব! তেজ, শক্তি, উৎসাহ, উদ্দীপনা, জীবন, জ্ঞান, আনন্দ, বুদ্ধিমতা - এসব তোমার মধ্যে উপনিষদসমূহ যেভাবে সঞ্চার করে তাতে যে কোন শব শিব হয়ে যাবে। এভাবে তুমি অথবা যে কোন ব্যক্তি মহাদেব, শিব হয়ে যেতে পারো। এই অপৌরষেয়ত্ব, গ্রন্থকার বিহীনতা উপনিষদসমূহকে সবচেয়ে প্রামাণিক শাস্ত্র বানিয়েছে। ইতিহাসবেত্তার ব্যক্তিগত স্বার্থ আদৃশ্য হলে , সেই ইতিহাস সত্য ও বাস্তব হয়। যখন বৈজ্ঞানিকের কায়েমী স্বার্থ থাকে না, বিজ্ঞান তখন সর্বজনীন ও উপযোগী হয়। বিজ্ঞানের গবেষণায় অনেক কিছুই বিজ্ঞানসম্মত নয়। এখন বেশির ভাগ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা -নিরীক্ষা ও গবেষণার উদ্দেশ্য হল কোন ভাবনা বা ধারণাকে প্রমাণিত করা যাতে সেই গবেষণায় যারা টাকা ঢেলেছে তাদের স্বার্থসিদ্ধি হয়। সিদ্ধান্ত আগেই ঠিক হয়ে আছে এবং তারপর হাইপোথেসিসকে খুঁটিয়ে না দেখেই গবেষণা করা হচ্ছে। সত্য গবেষণা, সত্য অন্বেষণে তো যে কোন হাইপোথেসিসকে খুঁটিয়ে দেখা উচিত। কায়েমী স্বার্থ প্রবেশ করলে সত্য বিনষ্ট হয়। সত্য কোথাও লক্ষ্য নয়। কদাচিৎ মানুষ আচমকা সত্য পেয়ে যায়। যদি তুমি সত্য জানতে চাও, তবে সেই সব বিজ্ঞানীদের কাছে যাও যাদের কেউ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অর্থ সাহায্য দেয় না। এই অপৌরষেয়ত্ব, প্রণবকার বিহীনতা, এই সত্যসকলের ক্ষমতাকে প্রামাণিকতা প্রদান করে, কারণ ঋষিগণ তাঁদের নাম প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কোনভাবেই আগ্রহী নন, লাভ বা অলাভজনিত আগ্রহের কথা তো ওঠেই না। সত্যের মহানতা দ্বারা অভিভূত হলেই বুঝতে পারবে তুমি সেই সত্যের মালিকানা নিতে পার না। তুমি জানবে যে সত্য তোমার চেয়ে অনেক বড়। তুমি সত্যের ওপরে দাঁড়িয়ে আছ, সত্য তোমার ওপরে নির্ভর ক’রে নেই। মহান ঋষিগণ আবিষ্কার করেন যে এই সত্যসকল সর্বজনীন, এই সত্যগুলিকে কোন ব্যক্তির সাথে চিহ্নিত ক’রে কলুষিত করা উচিত নয়। ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার মতামত সর্বদাই তার বলা কথাকে তুমি কিভাবে নেবে তা প্রভাবিত করে। স্বামী বিবেকানন্দ কথিত কিছু মহান সত্য বিশ্বজনীন ; কিন্তু যেই মুহূর্তে তুমি ঠিক কর যে ‘তিনি এক হিন্দু সন্ন্যাসী’, তুমি তাঁকে শোন না, সমগ্র বিশ্ব তাঁকে শোনে না, কেবল হিন্দুরা তাঁকে শোনে। কিছু মানুষ সম্প্রকে তোমার মতামত তোমায় বধির করে এবং তাঁদের অভিব্যক্ত মহান সত্যগুলি তুমি শুনতে পাও না। উপনিষদের ঋষিগণ এই প্রকর হানি চান নি, যে হানি লিখিত ধারণাগুলির ওপরে লেখকের ছবি ছেপে থাকার জন্য হয়। উপনিষদের ঋষিদের কি দারুণ মহানুভবতা ও তাঁদের সমর্পণের কি নিদারুণ নির্দশন! যদি তুমি কোন ব্যবসায়ীকে বল, 'তোমার মুখ কোাথাও দেখাতে হবে না, কিন্তু তুমি টাকা পেতে থাকবে', সে তা মানবে, কারণ টাকার জন্য সে অনেক কিছুই ছাড়তে খুশী হবে। কিন্তু খ্যাতি ও প্রচার দিয়েই তো সে তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বকে টাকা দ্বারাই বানিয়েছে। একইভাবে একজন নেতা টাকা ছাড়তে পারে প্রচার ও খ্যাতির জন্য, কারণ সে তার পুরো জীবনকে খ্যাতি ও প্রচার দিয়েই তৈরী করেছে। কিন্তু নেতা তার খ্যাতি ছাড়তে পারবে না। এক লেখক খাবার, ঘুম, টাকা সবকিছু ছাড়তে পারে, কিন্তু গ্রন্থকারিত্ব নয়, কারণ সে তার পুরো জীবন তো সেটা দিয়েই নির্মাণ করেছে। কিন্তু উপনিষদের গ্রন্থকারেরা মহত্তম। পৃথীগ্রহে লিখিত প্রথম গ্রন্থ হল উপনিষদসমূহ! প্রথম গ্রন্থের এঁরাই রচয়িতা। কি তাঁদের পরিপক্বতা! তাঁরা তো ত্যাগরাজা, ত্যাগের রাজা! যতদিন উপনিষদের ধারণাগুলি সজীব থাকবে, তা এই পৃথীগ্রহকে সজীব, অস্তিত্বমান রাখবে। তাই উপনিষদসমূহ কেবল প্রথম গ্রন্থই নয়, উপনিষদসমূহ পৃথিবীতে শেষ গ্রন্থও বটে, কারণ যতদিন এই সত্যসকল জীবিত থাকবে, পৃথিবীও টিকে থাকবে। এই সত্যসকল মুছে গেলে, পৃথিবীও শেষ হয়ে যাবে! মানবজাতির জঘন্য কর্মের পরেও যদি এই পৃথিবী টিকে যায়, তা কেবল এই উপনিষদের সত্যগুলিকে সজীব রাখার জন্য হবে, কারণ এই সত্যসকল কেবল পৃথীগ্রহের মানুষের কাছেই আছে, দেবতা ও অসুরদের কাছে নেই। এই সত্যসকল প্রাপ্ত ক'রে বিকিরণ করার জন্য কেবল মানুষ্যতন্ত্রই উপযোগী। বিজ্ঞান পূর্ণ হয় যখন বৈজ্ঞানিক বিজ্ঞানের সত্যে নিজেকে উৎসর্গ করেন। উপনিষদের ঋষিরা তার চরম উদাহরণ! তাঁরা সর্বাত্মক উৎকৃষ্ট সত্যধারী ও সর্বোচ্চ সিদ্ধির অধিকারী। ॐ ১৮ পরিচ্ছেদ 8 প্রথম ও প্রধানতম পবিত্র গ্রন্থাবলী বৈদিক প্রথায় উপনিষদসমূহ প্রথম ও প্রধানতম গ্রন্থাবলী। বৈদিক প্রথাই বিশ্বের প্রথম ও প্রধানতম প্রথা। উপনিষদের জীবনশৈলী ষড়দর্শন অর্থাৎ ছয়প্রকার মুক্ত চিন্তাধারার জন্ম দেয় যা থেকে পরে অগণ্য সম্প্রদায়, পরস্পরা, প্রথা ও ধর্মের জন্ম হয়।