দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ অপৌরষেয়, বিশুদ্ধ সত্যের গ্রন্থকার ছাড়া গ্রন্থ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ অপৌরষেয়, বিশুদ্ধ সত্যের গ্রন্থকার ছাড়া গ্রন্থ
মুক্তি বা জ্ঞানালোকপ্রাপ্তি (Enlightenment) শব্দ দ্বারা তোমাকে যে ধারণা, যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, অদ্বৈত জীবনের সত্য তার চেয়েও অনেক মহত্তর। মুক্তি কেবলমাত্র ভবিষ্যৎ বা বর্তমান সম্বন্ধীয়। একমাত্র অদ্বৈত জীবন সাহস ক’রে তোমাকে অতীত সম্বন্ধে সত্য বলতে পারে। ভবিষ্যৎ পূর্ণ না হলে অতীতকে পূর্ণ করা যায় না! তোমার মৃত্যু বা শেষ মুহূর্ত না আসা পর্যন্ত তোমার পুরো জীবন-ইতিহাস লেখা যায় না। একইভাবে তোমার ভবিষ্যৎকে শেষ না করা পর্যন্ত তোমার অতীতকে জমাট বাঁধানো যায় না। তাই এই বিভ্রমে থেকো না যে তুমি তোমার অতীতকে ইতিমধ্যে যাপন করে নিয়েছ ও তা সমাপ্ত। ভবিষ্যৎ, বর্তমান , অতীত ও সবকিছুকে অভিজ্ঞতামূলকভাবে উপলব্ধির করার নির্ণয় হ’ল অদ্বৈত জীবন। পূর্ণত্ব - এই মহান সত্যটিকে নিয়ে গভীরভাবে মনন করা শুরু কর, সম্পূর্ণ পূর্ণতার বিকিরণ কেবল ভবিষ্যৎ ও বর্তমান সম্বন্ধীয় নয়, তাতে অতীতও যুক্ত। ধ্যান কর, তুমি তা উপলব্ধি করবে। অদ্বৈত জীবনযাপনের নির্ণয় অর্থ, সম্পূর্ণ পূর্ণতার আকাশে পৌঁছানোর সংকল্প, যেখানে অতীতও পুনর্লিখিত হয়; কেবল বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নয়। পরিচ্ছেদ ২ অপৌরষেয়, বিশুদ্ধ সত্যের গ্রন্থকার ছাড়া গ্রন্থ অপৌরষেয় শব্দের অর্থ প্রণেতা-ব্যতীত, কেবল এই একটি শব্দ দ্বারা উপনিষদসমূহকে তোমাদের কাছে উপস্থাপিত করা হয়েছে। 7 কোনও গ্রন্থ ব্যাখ্যা করার আগে আমাদের স্পষ্ট করতে হয়, গ্রন্থটির উদ্দেশ্য কি এবং কে সেই উদ্দেশ্য ব্যক্ত করছে। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য ব্যক্ত করার আগে আমাদের ব্যাখ্যা করতে হবে, কে সেটা লিখছে। যখন কোন বই লেখা হয়, তাতে লেখা সত্য ও যে ব্যক্তি সেই সত্যকে উপস্থাপিত করছে, উভয়ই সেই বইয়ে প্রকাশিত হয়। সমস্ত বই তার লেখকের জীবনচরিত, কারণ এমন কোন বই নেই যেখানে লেখকের গন্ধ ও উপস্থিতি নেই। যত বেশী ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা থাকে, সেটা ততই বড় অলীক কাহিনী বা উপন্যাস হয়ে যায়। যে বইয়ে লেখক যত বেশী উপস্থিত থাকে, সত্য ততই কম প্রকাশিত হয়; যত বেশী ব্যক্তিগত স্পর্শ, বাস্তবতা তত কম হয়। কায়েমী স্বার্থপূর্ণ মন থেকে ইতিহাসকে সরিয়ে রাখতে হবে। মনের ভয় বা লোভ দ্বারা চালিত হয়ে লাভ ও ব্যবসা-কেন্দ্রিক হয়ে মানুষ ইতিহাস লেখে। দুর্বল্যবশতঃ, সমাজ সেই মনের ভয়, লোভ ও কায়েমী স্বার্থগুলিকে স্বীকার করে না। যখন কেউ বস্তগতভাবে লোভী হয়, সে কোটি পতি হয় ও তোমরা তা স্বীকার কর। কিন্তু মানসিকভাবে লোভী মানুষ মানবচেতনায় যে ক্ষতি করে, তা সমাজ স্বীকারই করে না। জীবনের মৌলিক জিনিষগুলিকে মানব মনের পাগলামি থেকে সরিয়ে রাখা উচিত। মানব-মন কোন ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করলে, সেই ব্যক্তির ভয় ও লোভকে নির্নয় নিতে অনুমতি দেওয়া হয়। তখন সত্য অশুদ্ধ হয় অথবা সত্যের হনন হয়। সামাজিকগত বা আইনানুযায়ী গৃহীত সামাজিক উন্মত্ততাগুলির মধ্যে ভয় পড়ে না। কিন্তু দুর্বলচিত্ত লোভ মানবসভ্যতায় বৈধ উন্মত্ততা হয়ে গেছে। লাভ-কেন্দ্রিক কায়েমী স্বার্থসকল, বিশেষত ভাবাদর্শগত ভয় ও লোভ থেকে মানবতাকে দূরে থাকা উচিত। যে সমাজ শান্তিতে বাস ও উপনিষদ যুগের সত্যলোক সৃষ্টি করতে চায়, সেই সমাজের বোঝা উচিত - ইতিহাস থেকেই তুমি নিজেকে উপলব্ধি কর, ইতিহাস থেকেই তোমাকে তোমার সম্বন্ধে শিক্ষা প্রদান করা হয়। সেজন্য যারা তোমাদের ইতিহাস লেখে, তাদের মানসিক ভয়, লোভ ও কায়েমী স্বার্থ থেকে মুক্ত থাকা উচিত। কায়েমী স্বার্থপর মানুষের লেখা ইতিহাসের ঘটনাগুলি পড়ে যদি তোমরা নিজেদের সম্বন্ধে এক ধারণা সৃষ্টি কর, তাহলে সেই ইতিহাস লেখক যে সমস্যাগুলিতে কষ্ট পাচ্ছিল তোমরাও সেই একই কষ্টে ভুগবে। খাদ্যগ্রহণ করার সময় তুমি কত সতর্ক থাক, কারণ সেই খাদ্য তোমার জীবনের অংশ হবে। একই প্রকার সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত যখন তুমি কোন ধারণা ভক্ষণ করতে যাও; যেমন বই পড়া, কোন তথ্য গ্রহণ করা। তোমাদের শিক্ষাকে অলাভজনক (নন-প্রফিট, ফর-প্রফিট) ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বাইরে হ’তে হবে। জ্ঞান নিঃশুল্ক। সেইজন্যই তোমাদের কাছে উপনিষদ এখন বিনামূল্যে উপলব্ধ। উপনিষদের সভ্যতাকে পুনরুদ্ধার করার একমাত্র উপায় হল - ইতিহাস যেন এমন মানুষেরা লেখে যাদের দৃষ্টি অকলুষিত। ভয় ও লোভ দ্বারা প্রভাবিত দৃষ্টি দেখা জিনিষকে বিকৃত করে ফেলে। বিকৃতভাবে লেখা সেই ঘটনা পড়ে তোমরা তা নিজেদের জীবনে আত্মভূত করা শুরু কর এবং সেই ইতিহাসবেত্তার ভয় ও লোভের একই সংস্কারগুলিকে নিজেদের জীবনে আত্মভূত কর। খাদ্য ও ওষুধে ভয় ও লোভ তোমার দেহকে অশুদ্ধ করে। ইতিহাস ও প্রাপ্ত ধারণাগুলিতে ভয় ও লোভ তোমার মনকে কলুষিত করে ফেলে। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ধারণাগুলিতে ভয় ও লোভ তোমার চেতনাকে বন্ধনে ফেলে। শারীরিক , বস্তুগত ও মানসিক কায়েমী স্বার্থ থেকে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতাকে সম্পূর্ণরূপে বাইরে রাখতে হবে। উপনিষদের কোন ঋষি কারো ভৃত্য বা বশং ছিলেন না। তাদের কোন কায়েমী স্বার্থ ছিল না অথবা কোন সংস্থার প্রতিপালন হেতু বা সেই সংস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোন ভাবাদর্শ ছিল না। এইরূপে কোন মানসিক বা বস্তুগত কায়েমী স্বার্থ না থাকার জন্য উপনিষদের ঐতিহ্য বিশুদ্ধ থেকে যায়। কোথাও ব্যক্তিগত প্রভাব ঢুকে পড়লে, তার শুদ্ধতা কম হয়। ব্যক্তি যত বেশী বিজড়িত, মানবতার জন্য তা ততই কম উপযোগী ও সত্য। এখন পর্যন্ত, মানবতা খুবই ব্যক্তিভিত্তিক, ব্যক্তিতান্ত্রিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক। উপনিষদ প্রথম লাইন থেকে, ভূমিকা থেকেই নিগূঢ় রহস্যময়। ‘অপৌরষেয়’, যার অর্থ প্রক্ষিপ্তকারহীন, কেবল এই একটি শব্দ দ্বারা তোমাদের সবার কাছে উপনিষদ উপস্থাপিত করা হল। কেন কোন লেখক নেই? কারণ এটাতে কোন কায়েমী স্বার্থের ছোঁয়া নেই। সেই স্বার্থগুলির নানা স্তর আছে : বস্তুগত স্তর - টাকাপয়সা। তারপর মানসিক স্তর - লোকেদের ইচ্ছামত প্রভাবিত ক’রে তাদের লীডার হওয়া। তারপর সমষ্টিগত মানসিক স্তর - কোন ভাবাদর্শকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জীবন্ত রাখার চেষ্টা ও মানবতাকে সেই ভাবাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং মানবতাকে সেই ভাবাদর্শ দ্বারা নিয়ন্ত্রণে ও বন্ধনে রাখা। উপনিষদ এই সব স্তরগুলির কলুষিতা থেকে মুক্ত। উপনিষদসমূহ হল অশুদ্ধতামুক্ত গ্রন্থ এবং সমস্ত মহাজগতের জ্ঞানের উৎস। কোন ব্যক্তিবিশেষ এতে জড়িত নেই, কোন ব্যক্তি এতে মহিমান্বিত হয় নি এবং কারো কোন কায়েমী স্বার্থ এতে বিদ্যমান নেই। ॥ অপৌরষেয় অপ্রমেয় অচিন্ত্য অনির্বচনীয় ॥ এর কোন গ্রন্থকার নেই, অপরিমেয়, অচিন্তনীয়, অবর্ণনীয় অপৌরষেয় অর্থাৎ গ্রন্থকার বিহীন। যে ঋষিরা এগুলি লিখে রেখেছেন, তাদের নাম রেকর্ড করা হয় নি কারণ সেই ঋষিদের কোন প্রভাবই উপনিষদ গ্রন্থে প্রকাশিত ভাবনাগুলিতে বা মহান সত্যগুলিতে নেই। তাই তা অপৌরষেয়। ব্রক্ষসুত্রের প্রথম শ্লোক হল : অথাতো ব্রক্ষজিজ্ঞাসা ॥ ১.১.১ ॥ এখন আমরা প্রকৃত সত্যের অন্বেষণ করি। এর অর্থ কোন কায়েমী স্বার্থ নেই, এটা কোন তত্ত্ব নয়, এমনকি ‘আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি’ এরূপ কোন অনুমানও নয়। ব্রক্ষসুত্র পাঠ করার পর শিষ্য নাস্তিক বা আস্তিক হওয়া পছন্দ করে নিতে পারে। এত সুবিশাল সম্ভাবনা। সম্ভাবনা ও মুক্তির উৎস থেকে জ্ঞানের প্রবাহিত হওয়া উচিত। কোন ভাবাদর্শ বা ধারণার প্রতি কায়েমী স্বার্থ বিনা উপনিষদের ঋষিদের অন্তর-আকাশ কত বিশুদ্ধ! সেইজন্য তাঁরা নিজেদের আধুনিকীকরণ ও নতুন করে আবিষ্কার করার জন্য এত প্রাণবন্ত ছিলেন। এই আধ্যাত্মিক সত্য গুলি লেখকদের কোন কায়েমী স্বার্থ বা ভয় বা লোভ দ্বারা প্রভাবিত নয়। সত্য গুলি প্রকাশিত করার সময় ভাবাদর্শের কত বিশুদ্ধতা প্রতিপালন করা হয়েছে! উপনিষদ এসেছে পরম সভ্য এবং সূক্ষ্মতম মস্তিষ্ক থেকে। যদি আমাদের সভ্যতা ভবিষ্যতে, কয়েক হাজার বছরে, পরিপক্কতা লাভ করে, তখন ধর্ম, ইতিহাস, তথ্য সম্প্রচার, এই তিনটি পুরোপুরি অনাভজনক ( নন্-প্রফিট) ব্যবস্থায় চলবে এবং ব্যক্তিবিশেষের ভয়, লোভ ও ভাবাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত থাকবে না। যখন সংস্থাগত অগ্রাধিকার চলে আসে ও বিবেচনাধীন হয়, তখন সত্যের সাথে আপোস করা হয়। ভয় ও লোভের হস্তক্ষেপ বিনা সেই শিক্ষাগুলির বিশুদ্ধতা বজায় রাখা হল একমাত্র উপায়, যার দ্বারা আমরা আমাদের কৃতজ্ঞতা, প্রেম, শ্রদ্ধা উৎসর্গ করতে পারি সেই মহান উপনিষদের ঋষিদের প্রতি, তাঁদের বিশুদ্ধতা, বলিদান ও উৎসর্জনের প্রতি। ঋষিগণ সত্যের বিশুদ্ধতা বজায় রেখেছিলেন কারণ সেটাই তো বিদ্যমান থাকার, শ্বাসপ্রশ্বাস নেবার, খাদ্য গ্রহণ করার, পোশাক পরিধান করার, চিত্তবিনোদন করার, জীবনের সুখ উপভোগ করার, চিন্তা করার, অনুভব করার সবচেয়ে উত্তম উপায়; অস্তিমান থাকার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় - সেটাই তো বিশুদ্ধ পথের উৎসে থাকা। উপনিষদের প্রথাতে ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক তত্ত্ব গুলির সম্পূর্ণ বিশুদ্ধতা প্রতিপালিত হয়। নিজেকে আশীর্বাদপুষ্ট অনুভব কর যে বৈদিক প্রথা আধ্যাত্মিক তত্ত্ব গুলিতে কোন বস্তুগত বা মানসিক কায়েমী স্বার্থ ছাড়া সর্বোত্তম বিশুদ্ধতা রেখেছে।