ধ্যানে কৃতজ্ঞতা
ধ্যানে কৃতজ্ঞতা
২৯ কৃতজ্ঞতা হল প্রার্থনা 54 কৃতজ্ঞতা হল প্রার্থনা। সাধারণত আমাদের আধ্যাত্মিক জীবন প্রার্থনা দ্বারা আরম্ভ হয় ও কৃতজ্ঞতায় গিয়ে পৌঁছায়। প্রার্থনার বিভিন্ন মাত্রা আছে। তুমি পরিপক্ক হবার সাথে সাথে প্রার্থনাও পরিপক্ক হয়। প্রার্থনা হল তোমার উচ্চতর চেতনাতে পৌঁছানোর সেতু। পৃথীগ্রহের দুঃখকষ্টের ঊর্ধ্বে যাবার জন্য প্রার্থনা হল এক সেতু। প্রার্থনা হল তোমাকে অতি চেতনার অবস্থায় পরিচালিত করার জন্য প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি। প্রার্থনার বিভিন্ন মাত্রাগুলিকে ধাপে ধাপে বোঝা যায়। প্রার্থনার বিভিন্ন গঠন আছে। কোনটা উচ্চ নয়, কোনটা নীচে নয়। যখনি তুমি শুরু করতে পার, তুমি শুরু কর। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে তুমি উচ্চতর চেতনার দিকে এগিয়ে যাবে। প্রথমে প্রার্থনা স্থূল স্তরে আরম্ভ হয় - মন্দিরে যাওয়া, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করা, দেবদেবীর মূর্তির কাছে প্রার্থনা করা এবং কিছু পূজা বা হবন করা। প্রার্থনার প্রথম স্তরটি বহিঃস্হত। প্রার্থনাকে বহিঃস্হত উপায়ে শুরু করতে হবে। প্রথম প্রার্থনা বহিঃস্হত পূজার স্তরে শুরু হয়। তারপর সেটা যায় ঔপচারিক পূজার স্তরে - তুমি শ্লোত্র সব কর, মন্ত্র উচ্চারণ কর, নাম জপ কর, তুমি ঐশ্বরিকতাকে উপাসনা কর, তুমি প্রার্থনা কর। এখন তুমি এক উচ্চতর স্তরে। প্রথমে পূজা, পরে জপ - শ্লোত্র ও বারবার মন্ত্র উচ্চারণ। এগুলিই হল বাচনিক প্রার্থনা। বাচনিক প্রার্থনা মনকে উচ্চতর আকাশে, উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাবার জন্য বিরাট ভূমিকা নির্বাহ করে - কিছু পবিত্র অক্ষর স্মরণ - সচেতনতা সহকারে অবিরাম সেগুলির পুনরাবৃত্তি। সেটা এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার; সচেতনতা ছাড়া পুনরাবৃত্তি এক অচেতন অভ্যাস হয়ে যাবে। দয়া করে সেটা করো না। তোমার মন যত বেশী পবিত্র অক্ষর, পবিত্র শব্দাবলী দ্বারা ভরে থাকবে, ততই তোমার ভিতরের কিচিরমিচির পরিশোধিত হবে। তোমার ভিতরের কিচিরমিচির প্রায় যেন আবর্জনা হয়ে গেছে। তোমার সত্তার মধ্যে তুমি কত কিছুই না দমিত করে রাখ, কত ক্রোধ ও কত হিংস্রতা। সেগুলি সব কোথায় যাবে? সেগুলি তো তোমার ভিতরের কিচিরমিচির হয়ে গেছে। তোমার ভিতরে দমিয়ে রাখা জিনিষ থেকে ভিতরের কিচিরমিচির তৈরী হয়। যদি তুমি অনেক হিংস্রতা দমিয়ে রাখ, যদি তুমি অনেক ঔদ্ধত্যকামনা দমিয়ে রাখ, যদি তুমি অনেক ক্রোধ দমিয়ে রাখ, সেগুলি অচেতনভাবেই তোমার ভিতরের কিচিরমিচির হয়ে যায়। তুমি ভিতরে যা দমিয়ে রাখ, সেগুলিই তোমার ভিতরের কিচিরমিচির তৈরী হয়। যা তুমি ভিতরে রাখ, তাই তো বার হয়ে আসবে। যদি তুমি ভিতরে মন্ত্র রাখ, ভিতরে পবিত্র অক্ষর রাখ, ভিতরে ঐশ্বরিক শব্দাবলী রাখ, ভিতরে শ্লোত্র রাখ, ভাল কথা রাখ, দেখবে যে তুমি সেই সুন্দর শব্দাবলী, একই সুন্দর অনুভূতি, একই দিব্য উৎফুল্লতা বিকিরণ করছ। যতই তুমি সঠিক শব্দ উচ্চারণ করবে, তত কম তুমি বেঠিক শব্দাবলী উচ্চারণ করবে। ৩০ কৃতজ্ঞতা হল একৃত অভিজ্ঞতা করা 56 তৃতীয় স্তরের প্রার্থনা হল মানসিক প্রার্থনা। প্রার্থনা তৃতীয় স্তরে পৌঁছালে সেটা মানসিক হয়। প্রথম বস্তুগত বা স্থূল, দ্বিতীয় বাচনিক বা মৌখিক, তৃতীয় মানসিক। মানসিক স্তরে এটাকে বলা হয় ধ্যান। বস্তুগত স্তরে প্রার্থনাকে বলা হয় পূজা। বাচনিক স্তরে এটাই হল জপ। মানসিক স্তরে এটাকে বলা হয় ধ্যান। এই স্তরে পৌঁছালে তোমার দেহকে বিজড়িত হবার প্রয়োজন নেই, আবার তোমার ভিতরের ফিচারমিচারকেও বিজড়িত হবার প্রয়োজন নেই; তখন তোমার সত্তা সমর্পণ করা শুরু করবে। জপ হল বাচালোপ; ধ্যান হল একাত্ম হওয়া। প্রার্থনাতে সেটা হল তুমি ও ঈশ্বরের মধ্যে বাচালোপ করে যোগাযোগ, ধ্যানে সেটা হল তুমি ও ঈশ্বরের একাত্ম হওয়া। তুমি ঐশ্বরিকতার আভাসদান অভিজ্ঞতা করতে আরম্ভ কর, তুমি ঐশ্বরিকতার ঝলক অভিজ্ঞতা করা শুরু কর, তুমি আনন্দের ঝলক অভিজ্ঞতা করা শুরু কর। গুরুত্বপূর্ণ জিনিষটি - যতক্ষণ তুমি পূজা ও জপ কর, তুমি ও ঈশ্বর পৃথক। যেই মুহূর্তে তুমি ধ্যানে প্রবেশ কর, তুমি তোমার ঈশ্বরত্ব উপলব্ধি করা শুরু কর, তুমি নিজের ন্যূতম ঐশ্বরিকতা অভিজ্ঞতা করা শুরু কর, তুমি ঐতাদৃশ্য যা পূজা করেছি তার ঝলক পেতে শুরু কর। 'তুমি' ও তোমার মধ্যে এক অন্য একাত্মতা শুরু হয়; এমন কি সেটা তো তুমি ও ঈশ্বরের মধ্যেও নয়, কারন ঈশ্বর তোমার সত্তার অংশ হয়ে যান, তুমি তো তার অংশ হয়ে যাও। বিন্দু মহাসাগরে মিলিয়ে যায়, মহাসাগর বিন্দুতে মিলিয়ে যায়। তুমি ঝলক অভিজ্ঞতা করা শুরু কর, তুমি অনুভব করা আরম্ভ কর যে তুমি পূর্ণের অংশ, অদ্বৈত অভিজ্ঞতা হয়। অদ্বৈত অর্থ দুই নয় - একাত্মবোধের এক অনুভূতি তোমার সত্তায় ঘটা শুরু হয় - সে এক ভিন্ন প্রকার অভিজ্ঞতা। যতক্ষণ জপ কর, তুমি উপাসনা করছ। যেই মুহূর্তে তুমি ধ্যানে প্রবেশ কর, তুমি যে জিনিষ পূজা করছ সেটার সাথে মিলিয়ে যাও, সেটার সাথে তুমি একাকার হয়ে যাও, তুমি চৈতন্য অভিজ্ঞতা করা শুরু কর। সর্বশেষ বা চতুর্থ ধাপটি হল, তুমি বিদ্যমান নেই এবং ঈশ্বরও বিদ্যমান নেই। উদ্ভয়েই অভিজ্ঞতাতে মিলিয়ে যায়; সেটাকেই আমি বলি কৃতজ্ঞতা। 57 চতুর্থ স্তরে, আধ্যাত্মিক স্তরে, তুমি কেবল একাকার অনুভব কর তা নয়, একাকারের ধারণাও মিলিয়ে যায়। কেবল একটা জিনিষ অবশিষ্ট থাকে, কৃতজ্ঞতা! কার প্রতি? কারও প্রতি নয়! কেবল কৃতজ্ঞতা! কারও উদ্দেশ্যে নয়। যতক্ষণ কারও উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়, সেখানে দুইজন থাকবে; একজন যে জ্ঞাপন করে, একজন যে গ্রহণ করে। কিন্তু ছুঁড়ান্ত স্তরে সেটা কারও জন্য জ্ঞাপন করা হয় না, সেটা কেবল উপচে পড়তে থাকে। কৃতজ্ঞতা থেকে শক্তি নিজেকে প্রকাশ করে, আনন্দ থেকে শক্তি নিজেকে প্রকাশ করে, পরিপূর্ণতার সে এক গভীর অনুভূতি। সেটাকে আমরা বলি সমাধি। সমাধি অর্থ, সত্তা সম্পূর্ণভাবে পরিপূর্ণ হবার পরে নিজেকে শক্তি হিসাবে প্রকাশ করে। কেউ প্রকাশ করে না, কেউ গ্রহণ করে না; কেবল অভিজ্ঞতা। এই স্তরে অভিজ্ঞতাকারী এবং যা অভিজ্ঞতা করা হয়েছে, তা অভিজ্ঞতায় মিলিয়ে যায়। সেই সময় - কেবল একটা জিনিষ বিদ্যমান থাকে, সেটা হল কেবলমাত্র অভিজ্ঞতা; অভিজ্ঞতাকারী নয়। অথবা যা অভিজ্ঞতা করা হয়েছে, তাও নয়। উদ্ভয়ই এক সত্তায় মিশে যায়। সেটাকে আমরা বলি অভিজ্ঞতা। তুমি অনুভব কর যে জীবন তোমার ওপর কতই না বর্ণন করছে। তুমি অনুভব কর 'এটা তো অত্যধিক, আমি আর সহ্য করতে পারছি না।' সেটা এত আনন্দ, এত উচ্ছ্বাস যে তুমি তোমার পরিচিতি হারাতে শুরু কর। তুমি তোমার সীমানা হারাতে শুরু কর। যতক্ষণ তোমার মধ্যে কঠোর চিহ্ন থাকে, ততক্ষণ তোমার পরিচিতি থাকে। যেই মুহূর্তে তোমার ছঃখকষ্ট দূর হয়, তুমি তোমার সীমানােখা হারিয়ে ফেল।