কৃতজ্ঞতা? না ধন্যবাদ!
কৃতজ্ঞতা? না ধন্যবাদ!
১৯ কৃতজ্ঞতা তোমাকে বেদনার উর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে 38 আমার হাতভাঙ্গা এবং সেটা থেকে কি শেখার আছে সে সম্পর্কে কিছু বলব। যে শিক্ষার মধ্য দিয়ে আমি গেছি ও তোমরা সবাই যা শিখতে পার, শিখে নাও। প্রথমে যে প্রশ্ন সবাই করে তা হল, ‘স্বামীজী কেন ঘোড়ায় চড়তে গেলেন? কি দরকার ছিল?’ দ্যাখো, জীবন এই নয় যে এই বিচ্ছিন্ন থেকে উঠতে হবে, এই মেকেতে হাঁটতে হবে এবং এই গাড়িতে চড়তে হবে, এই অফিসে যেতে হবে, ফিরে এসে এই বিচ্ছিন্নায় শুয়ে পড়তে হবে। জীবন হল শিক্ষা। তাই আমি ভাবলাম ঘোড়ায় চড়া শিখি না কেন। আর যাই হোক না কেন, অশ্বারোহণ, সাঁতার এগুলো তো আমাদের জন্মসূত্রে আছে। সেটাকে জাগ্রত করলে তা প্রকাশিত হবে। তাই আমি ভাবলাম, ‘চেষ্টা করা যাক না কেন?’ সেইজন্য আমি চেষ্টা করেছিলাম। অশ্বারোহণ ঠিকই চলছিল। রোজ তা ঠিকই চলছিল এবং প্রতিদিন আমি আশ্রমের চারিদিকে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরতাম; সকালে ও সন্ধ্যায়। নির্দিষ্ট সেই দিনটিতে আশ্রমে জোরে গান চালানো হচ্ছিল এবং সকল আশ্রমবাসীরা জোরে জোরে উল্লাসধ্বনি করতে আরম্ভ করল। তাই ঘোড়াটি একটু উত্তেজিত হল এবং আমি ঘোড়া থেকে পড়ে গেলাম। যেই মুহূর্তে পড়লাম, আমি ভাবলাম, ‘ওহ! আশ্রমবাসীরা যেন কষ্ট না পায়’ আমার চারপাশে সমস্ত ব্রক্ষচারী ও আশ্রমবাসীরা যেন কষ্ট না পায়। প্রথমেই আমি বললাম, ‘আমি ঠিক আছি। উদ্বিগ্ন হও না।’ উঠে পড়ার পরে আমি আমার হাত ভেঙেছে দেখলাম এবং তাদের বললাম, ‘হয়ত হাত ভেঙেছে। চল হাসপাতালে যাওয়া যাক এবং কি করতে হবে করা যাক।’ আমরা হাসপাতালে গেলাম। আমি সকাল সাতটায় পড়ে গিয়েছিলাম এবং আড়াইটার সময় তারা সার্জারী করল। সেই সময় পর্যন্ত আমি ব্যাথা বন্ধ করার জন্য কোন ওষুধ বা এ্যানেস্থেসিয়া নিই নি। ভাঙ্গাটা দু জায়গায় হয়েছিল। হাড়গুলো টুকরো টুকরো হয়েছিল। ডাক্তাররা অবাক হয়েছিল। তারা বারবার বলছিল, ‘কোন ব্যাথা নেই বলতে আপনি কি বোঝাচ্ছেন স্বামীজী?’ আমি বললাম, ‘আমি জানি না।’ প্রকৃতপক্ষে হাতভাঙ্গাতে আমার দেহে কোন প্রভাব বা সমস্যা হয় নি। কোন কষ্ট ছিল না এবং কোন বেদনাও ছিল না। ডাক্তাররা বলছিলে অসন্তব। ডাক্তাররা বলছিল যে অসহ্য ব্যাথা নিশ্চয় হচ্ছে কারণ একটা হাড় চামড়া ছিঁড়ে বার হয়ে এসেছিল। হাড় দুই জায়গায় ভেঙেছিল ও তিন চার টুকরার সাথে রক্ত পড়ছিল। তুমি প্রশ্ন করতে পার, ‘ব্যাথা নেই কেন?’ দ্যাখো কোন কষ্ট ছিল না। আমি পিছনে ফিরে তাকিয়ে চিন্তা করি নি যে কেন ঘোড়ায় চড়তে গেলাম। আমি ঘোড়ায় চড়া এড়িয়ে যেতে পারতাম অথবা এই ব্রক্ষচারীরা গান বাজানো এড়াতে পারত। আমি সে সম্পর্কে কিছুই ভাবি নি অথবা কি হয়েছিল তা পিছনে ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করিনি ‘কেন?’। সময়-চক্রের (অতীত, বর্তমান অথবা ভবিষ্যৎ) দিকে ‘কেন’ প্রশ্ন করে তাকাতে নেই। সময়চক্রের দিকে মননাত্মদত্তের মেজাজে কখনও তোমার তাকানো উচিত নয়। আমি মননাতদত্ত করি না। জীবন এই প্রকার, ব্যস। হয় সময়কে গভীর সম্পূর্ণ শিকৃতি অথবা কৃতজ্ঞতা সহকারে দেখ। আমি কৃতজ্ঞতা সহকারে তাকিয়েছিলাম। ঈশ্বর সৌভাগ্যবশত মাঝে কোন আঘাত লাগে নি। পিঠে কোন আঘাত লাগে নি। সৌভাগ্যবশত ঘোড়া থেকে পড়ে গেলে লোকেরা মাথায় চোট পায়। তারা কাঁধের হাড় ভাঙলে। সেরকম তো কোন আঘাত লাগে নি?’ তাই আমি তো সময়ের দিকে কৃতজ্ঞতা সহকারে তাকিয়েছিলাম। জীবনের দিকে মননাতদত্তের মেজাজে তাকাবে না। আমি ভাবতে পারতাম, ‘ওহ! এরা তো গান এড়িয়ে যেতে পারত। এরা না চাঁচালে, উল্লাসধ্বনি না করলে ঠিক থাকত। আমি ঘোড়ায় না চড়লেই হত। এই বয়সে আমার ঘোড়ায় চড়ার কি প্রয়োজন? কে আমাকে ঘোড়ায় চড়তে বলেছিল?’ ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্যে কৃতজ্ঞতা 40-41 পাশ্চাত্য থেকে সুন্দর যে জিনিষগুলি আমি শিখেছি তার মধ্যে একটি হল ধন্যবাদ জ্ঞাপন। বুঝে নাও, আমি উন্মুক্ত ও সরল; যা কিছুই বলা বা করা হোক না কেন, যে কোনভাবেই হোক ধন্যবাদ জ্ঞাপনের ধারণাটি ভারতবর্ষে ছিল না, এই ধারণাটি ভারতে এতটা গভীরে ছাপ ফেলে নি। কেবল পাঁচালো এই ধন্যবাদ জ্ঞাপনের অনুষ্ঠানকে আমি বিশেষ করে বিরাট গুরুত্ব ও শ্রদ্ধা জানাতে দেখলাম। হ্যাঁ, অনেক সুন্দর জিনিষই আমাদের শেখার আছে। তাই এই দেশ, এই প্রথা থেকে আমার শেখা মহান জিনিষগুলির মধ্যে এটি একটি। এমনকি সৌখিকভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করাকেও এই সংস্কৃতিতে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সেটা দরকার। বৈদিক প্রথাতে ধন্যবাদ জ্ঞাপন অথবা কৃতজ্ঞতা এক আধ্যাত্মিক গুণমান হয়ে গেছে। সেটা কখনও সামাজিক গুণমান ছিল না। সেটা ছিল এক আধ্যাত্মিক গুণমান হিসাবে। কিন্তু এখানে (পাশ্চাত্যে) আমি দেখলাম, সেটা দৈনন্দিন জীবনে স্পন্দনশীল ও সজীব। এটি একটি সামাজিক গুণমান এবং আমাদের তা শেখা উচিত ও আয়ত্ত করা উচিত। হাজার হাজার উপায়ে তুমি জীবনের প্রতি ‘কেন’ প্রশ্ন ওঠাতে পার। কিন্তু জীবনের প্রতি ‘কেন’ প্রশ্ন সর্বদাই দুঃখকষ্ট নিয়ে যায়। কেন, যদি ও স্ত্রী (why, if and wife)! তিনটিই দুঃখকষ্ট নিয়ে যায়। ‘কেন’ কোন উত্তর দেয় না। তা কেবল বেশী, আরো বেশী দুঃখকষ্ট প্রদান করে। এসো! এই একটি ধারণা সহকারে কয়েক মিনিট বসো, ‘আমাকে জীবনের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা অথবা সম্পূর্ণ স্বীকৃতি সহকারে এগোতে দাও। জীবনকে কোন ‘কেন’ নয়।’ হয়ত আমি বলতে পারি এটি একপ্রকার অবিশ্রাম ধ্যান, প্রাত্যহিক ধ্যান। যখনই তুমি ‘আপনাকে বা তোমাকে ধন্যবাদ’ কথাটা বল, সেটা যেন এক প্রাত্যহিক ধ্যান, তোমাকে স্মরণ করানো কৃতজ্ঞতা কিভাবে আধ্যাত্মিক অভ্যাস হয়ে যায়। আজ একটা মজার এবং অতীন্দ্রিয়-সমন্বীয় ঘটনা ঘটে। পূজাবিধি ও যজ্ঞের সময়ে আমি গভীর নীরবতা ও সমাধিতে ছিলাম। আমি দেখলাম আমার পিছনে বসা দুই এক জন একটু অস্বস্তিতে আছে। অবশ্য আমি শারীরিকভাবে দেখি নি, যেহেতু সমাধিতে ছিলাম আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম আমার আশেপাশে লোকেদের মনে কি চলছে।