1. Upanishad Samuh
প্রথম পরিচ্ছেদ উপনিষদসমূহ : সম্পূর্ণ পূর্ততের আদি উৎস
এই অভিব্যক্তিকে বলা হবে অদ্বৈতজীবন সিরিজ। আমি ব্যাখ্যা করতে যাচ্ছি না, আমি কেবল ঋষিদের মধ্যে ঠিক যেমন কথোপকথন হয়েছিল তা শ্রবণ করে তোমাদের উপহার দিতে যাচ্ছি! ॐ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাত্ পূর্ণমুদচ্যতে । পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে ॥ ॐ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥ পরিচ্ছেদ ১ উপনিষদসমূহ : সম্পূর্ণ পূর্ণত্বের আদি উৎস অদ্বৈতজীবন অর্থ উপলব্ধি করা যে তুমি পূর্ণ, পূর্ণের সাথে এক, তুমি ভগ্ন, বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত অংশ নও। সম্পূর্ণ পূর্ণত্বের সেই উপলব্ধি, এমনকি অতীতের সাথেও, কেবল উপনিষদই প্রদান করতে পারে। ভগ্ন, বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত অর্থ বরাবরের মত আলাদা হয়ে যাওয়া, ভিতরে বিভক্ত হওয়া ও অন্তরীণ পুনর্বিভাজন। তুমি ভগ্ন নও, বিচ্ছিন্নও নও, আবার পূর্ণ থেকেই কোন খণ্ডিত অংশেও প্রবেশ কর নি। পূর্ণ পূর্ণ হয়েই আছে। এমন নয় যে তুমি এখন পূর্ণত্ব প্রাপ্ত করবে এবং ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ পূর্ণত্ব অভিজ্ঞতা করবে। যখ ন তুমি উপলদ্ধি কর যে তোমার অতীতেও তুমি সর্বদা সম্পূর্ণ পূর্ণ ছিলে, তখন পূর্ণতা হ’ল সম্পূর্ণ পূর্ণতা। যখন তুমি বোঝ যে অতীতেও তুমি পূর্ণ ছিলে, তখন পূর্ণতার গভীরতা তোমার মধ্যে পূর্ণ হয়। যখন তোমার অতীতের অপূর্ণতা কেবল অর্থহীন ও অপ্রাসঙ্গিকই নয়, তা স্মরণেই আসে না ও বোধগম্যও হয় না, তখন তুমি অদ্বৈত জীবন যাপন করছ। যে মানুষ বলে, ‘ভবিষ্যতে আমি পূর্ণ হব,’ সে যোগী। যে মানুষ বলে, ‘এখনই আমি সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ,’ সে তান্ত্রিক। যে মানুষ হৃদয়ঙ্গম করেছে, ‘কেবল ভবিষ্যৎ ও বর্তমানেই নয়, অতীতেও আমি সম্পূর্ণ পূর্ণ ছিলাম,’ সে অদ্বৈতী। অদ্বৈত জীবন যাপন অর্থ, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানে তুমি মায়া থেকে মুক্ত হবার অভিজ্ঞতা পাবে, কেবল এই উপলদ্ধি নয়। অদ্বৈত জীবনে উপলদ্ধি হয় যে অতীতেও তুমি কখন মায়ার জালে আটকে ছিলে না। উপনিষদসমূহ হল সমস্ত ধর্মগুলির আদি উৎস, সমস্ত সত্যের মূল উৎস! উপনিষদের প্রধান বাণী এই নয় যে ভবিষ্যতে তুমি পূর্ণ হবে, তা 'যোগসূত্র'-এর বাণী। 'তুমি তো এখনই পূর্ণ,' তা 'শিবসূত্র'-এর বাণী। 'অতীতেও তুমি পূর্ণ ছিলে,' তা উপনিষদের বাণী। ভবিষ্যৎ ও বর্তমানে পূর্ণ হবার সাথে যখন তুমি উপলব্ধি কর যে অতীতেও তুমি পূর্ণ ছিলে, তখনই তোমার সম্পূর্ণ হিলীং (নিরাময়) ঘটে। অতীতেও তুমি যে সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ ছিলে, তোমাকে সে কথা বলার ও অভিজ্ঞতা প্রদান করার সাহস কেবল উপনিষদের আছে! তুমি যোগসূত্র অভ্যাস করলে কি ঘটবে তার পূর্বাভাস পাওয়া যায়। শিবসূত্র অভ্যাস করলে কি ঘটবে তা ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু উপনিষদ উপলব্ধি করলে কি ঘটবে তার পূর্বাভাস পাওয়া যায় না, আবার ব্যাখ্যাও করা যায় না। ঐশ্বত জীবন যাপন অর্থ কেবল ভবিষ্যৎ ও বর্তমানের সাথে সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ হওয়া নয়, কিন্তু অভিজ্ঞতামূলকভাবে উপলব্ধি করা যে অতীতেও তুমি সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ ছিলে। তোমার মধ্যে কখনও কোন অপূর্ণতা ছিল না। এই উপলব্ধি হল ঐশ্বত জীবন এবং একমাত্র উপনিষদ তা প্রদান করতে পারে। কেবল তোমার ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকে নয়, ঐশ্বত জীবন তোমার অতীতকেও নিরাময় করে, পূর্ণ করে, পরিতৃপ্ত করে ও আনন্দময় করে। কেবল ঐশ্বত জীবনই তোমার অতীতকে পরিবর্তন করতে সমর্থ। তুমি ভাবতে পার, 'অতীত কিভাবে পরিবর্তিত হবে? তা তো হয়ে গেছে!' না! কিছুই হয়ে যায় নি! অতীতের যা কিছু তুমি স্মরণে রাখ, তা এখনও আছে, তা বিদ্যমান। যা কিছু অনুপস্থিত তার জীবন নেই বা তোমার ওপরে প্রভাব নেই। তাই অতীত বা ভবিষ্যৎ হল বর্তমান। যতক্ষণ তুমি স্মরণে রাখ , তা জীবন্ত। ভবিষ্যতের জন্য ইচ্ছিত তোমার সমস্ত বাসনা, সৃষ্টি ও ঘোষণাগুলি তো বর্তমানেই আছে। তাই সেগুলিকে অভিজ্ঞতা করার উদ্দেশ্যে সেগুলির দিকে তোমায় চালিত করার জন্য তারা এত শক্তিশালী । তোমার সমস্ত বেদনা, অপরাধবোধ ও অপূর্ণতা হল অতীত সম্বন্ধীয়, কিন্তু তা আছে বর্তমানে। তাই তা এখনও দুঃখজনক, অভিজ্ঞতামূলকভাবে অপূর্ণ। অভিজ্ঞতামূলকভাবে অতীতকে বর্তমানে, ভবিষ্যৎকে বর্তমানে ও বর্তমানকে বর্তমানে পূর্ণ করতে, কেবল উপনিষদই এক স্বচ্ছ প্রতীতি সহকারে ঘোষণা করে। আর যখন বর্তমানের বর্তমানে, অতীতের বর্তমানে ও ভবিষ্যতের বর্তমানে পূর্ণতা ঘটে, তখন সম্পূর্ণ পূর্ণতা ঘটে। তখন তোমার কেবল বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নয়, অতীতও রূপান্তরিত হয়! মহাবিশ্বে অদ্বৈত উপলব্ধি ক'রে জীবন যাপন শুরু না করা পর্যন্ত কোন হিসাবই মিটে যায় না। জীবনে সর্বশেষ বিজয় হ'ল অদ্বৈত জীবন এবং তা অর্জন করলে তোমার সমস্ত ইতিহাস, তোমার অতীত পুনর্লিখিত হবে। জেনে রাখ, কেবল তোমাকে অদ্বৈত জীবনে প্রবেশ করানোর জন্য তোমার অতীত জমা থাকে, কিন্তু রেকর্ড করা হয় না। তোমার (অতীতের) সমস্ত ফাইলগুলি পেশিং (মূলতবি) থাকে, আর্কাইভ (সংরক্ষণাগারে) থাকে না। যখন কারো অতীত বৃক্ষাণে রেকর্ড হয়ে যায়, তা 'পুরাণ' হয়ে অবতরণ করে। তার অর্থ অ্যামিবা থেকে অনন্তনারায়ণ, এই মহাযাত্রা সে সম্পূর্ণ করেছে, বিজয়ী হয়েছে এবং তা বৃক্ষাণে রেকর্ড হয়েছে। তাই এখন সে ভগবত্ পুরাণে প্রকাশিত হয় মৎস্যাবতার থেকে কক্ষি অবতার পর্যন্ত। এমনকি এখনই জাগ্রত হয়ে এবং অদ্বৈত জীবন যাপন করে আমরা ইতিহাস পুনর্লিখন করতে পারি। কেবল সামাজিকভাবেই নয়, মহাজাগতিকভাবেও! যোগপিতা পতঞ্জলি সাহস করে বলেন, 'তোমার ভবিষ্যতকে পূর্ণ করা যায়।' মহাদেব সাহস করে বিজ্ঞান-ভৈরব-তন্ত্রে এই পর্যন্ত বলেছেন, 'এই প্রক্রিয়াগুলি অভ্যাস কর, এমনকি তোমার বর্তমানও পূর্ণ হবো।' একমাত্র উপনিষদ, যা বাস্তবিক কেউ লেখে নি, কিন্তু চ্যানেল-কৃত হয়েছ; বলার দুঃসাহস রাখে, 'কেবল তোমার ভবিষ্যৎ ও বর্তমান নয়, তোমার অতীতকেও রূপান্তরিত ও পুনর্বিন্যাস করা যায়।' কারণ অদ্বৈত জীবন যাপন আরম্ভ না করা পর্যন্ত কিছুই পূর্ণ হয় না। মহাদেব নীরবে বটবৃক্ষতলে দক্ষিণামূর্তি হয়ে উপবেশন ক'রে বেদসমূহ বা মহাজাগতিক জ্ঞানকে স্পন্দিত করেন এবং তাকে এক অনুবাদশীল প্রাণবন্ত নীরবতা হিসাবে বিকিরণ করেন। আর ঋষিগণ তা আকাশ লেখন হিসাবে পাঠ করেন এবং বিশ্বের সাথে শেয়ার করেন। এইভাবে উপনিষদ ঘটে এবং পৃথিবীতে প্রকাশিত হয়।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ অপৌরষেয়, বিশুদ্ধ সত্যের গ্রন্থকার ছাড়া গ্রন্থ
মুক্তি বা জ্ঞানালোকপ্রাপ্তি (Enlightenment) শব্দ দ্বারা তোমাকে যে ধারণা, যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, অদ্বৈত জীবনের সত্য তার চেয়েও অনেক মহত্তর। মুক্তি কেবলমাত্র ভবিষ্যৎ বা বর্তমান সম্বন্ধীয়। একমাত্র অদ্বৈত জীবন সাহস ক’রে তোমাকে অতীত সম্বন্ধে সত্য বলতে পারে। ভবিষ্যৎ পূর্ণ না হলে অতীতকে পূর্ণ করা যায় না! তোমার মৃত্যু বা শেষ মুহূর্ত না আসা পর্যন্ত তোমার পুরো জীবন-ইতিহাস লেখা যায় না। একইভাবে তোমার ভবিষ্যৎকে শেষ না করা পর্যন্ত তোমার অতীতকে জমাট বাঁধানো যায় না। তাই এই বিভ্রমে থেকো না যে তুমি তোমার অতীতকে ইতিমধ্যে যাপন করে নিয়েছ ও তা সমাপ্ত। ভবিষ্যৎ, বর্তমান , অতীত ও সবকিছুকে অভিজ্ঞতামূলকভাবে উপলব্ধির করার নির্ণয় হ’ল অদ্বৈত জীবন। পূর্ণত্ব - এই মহান সত্যটিকে নিয়ে গভীরভাবে মনন করা শুরু কর, সম্পূর্ণ পূর্ণতার বিকিরণ কেবল ভবিষ্যৎ ও বর্তমান সম্বন্ধীয় নয়, তাতে অতীতও যুক্ত। ধ্যান কর, তুমি তা উপলব্ধি করবে। অদ্বৈত জীবনযাপনের নির্ণয় অর্থ, সম্পূর্ণ পূর্ণতার আকাশে পৌঁছানোর সংকল্প, যেখানে অতীতও পুনর্লিখিত হয়; কেবল বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নয়। পরিচ্ছেদ ২ অপৌরষেয়, বিশুদ্ধ সত্যের গ্রন্থকার ছাড়া গ্রন্থ অপৌরষেয় শব্দের অর্থ প্রণেতা-ব্যতীত, কেবল এই একটি শব্দ দ্বারা উপনিষদসমূহকে তোমাদের কাছে উপস্থাপিত করা হয়েছে। 7 কোনও গ্রন্থ ব্যাখ্যা করার আগে আমাদের স্পষ্ট করতে হয়, গ্রন্থটির উদ্দেশ্য কি এবং কে সেই উদ্দেশ্য ব্যক্ত করছে। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য ব্যক্ত করার আগে আমাদের ব্যাখ্যা করতে হবে, কে সেটা লিখছে। যখন কোন বই লেখা হয়, তাতে লেখা সত্য ও যে ব্যক্তি সেই সত্যকে উপস্থাপিত করছে, উভয়ই সেই বইয়ে প্রকাশিত হয়। সমস্ত বই তার লেখকের জীবনচরিত, কারণ এমন কোন বই নেই যেখানে লেখকের গন্ধ ও উপস্থিতি নেই। যত বেশী ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা থাকে, সেটা ততই বড় অলীক কাহিনী বা উপন্যাস হয়ে যায়। যে বইয়ে লেখক যত বেশী উপস্থিত থাকে, সত্য ততই কম প্রকাশিত হয়; যত বেশী ব্যক্তিগত স্পর্শ, বাস্তবতা তত কম হয়। কায়েমী স্বার্থপূর্ণ মন থেকে ইতিহাসকে সরিয়ে রাখতে হবে। মনের ভয় বা লোভ দ্বারা চালিত হয়ে লাভ ও ব্যবসা-কেন্দ্রিক হয়ে মানুষ ইতিহাস লেখে। দুর্বল্যবশতঃ, সমাজ সেই মনের ভয়, লোভ ও কায়েমী স্বার্থগুলিকে স্বীকার করে না। যখন কেউ বস্তগতভাবে লোভী হয়, সে কোটি পতি হয় ও তোমরা তা স্বীকার কর। কিন্তু মানসিকভাবে লোভী মানুষ মানবচেতনায় যে ক্ষতি করে, তা সমাজ স্বীকারই করে না। জীবনের মৌলিক জিনিষগুলিকে মানব মনের পাগলামি থেকে সরিয়ে রাখা উচিত। মানব-মন কোন ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করলে, সেই ব্যক্তির ভয় ও লোভকে নির্নয় নিতে অনুমতি দেওয়া হয়। তখন সত্য অশুদ্ধ হয় অথবা সত্যের হনন হয়। সামাজিকগত বা আইনানুযায়ী গৃহীত সামাজিক উন্মত্ততাগুলির মধ্যে ভয় পড়ে না। কিন্তু দুর্বলচিত্ত লোভ মানবসভ্যতায় বৈধ উন্মত্ততা হয়ে গেছে। লাভ-কেন্দ্রিক কায়েমী স্বার্থসকল, বিশেষত ভাবাদর্শগত ভয় ও লোভ থেকে মানবতাকে দূরে থাকা উচিত। যে সমাজ শান্তিতে বাস ও উপনিষদ যুগের সত্যলোক সৃষ্টি করতে চায়, সেই সমাজের বোঝা উচিত - ইতিহাস থেকেই তুমি নিজেকে উপলব্ধি কর, ইতিহাস থেকেই তোমাকে তোমার সম্বন্ধে শিক্ষা প্রদান করা হয়। সেজন্য যারা তোমাদের ইতিহাস লেখে, তাদের মানসিক ভয়, লোভ ও কায়েমী স্বার্থ থেকে মুক্ত থাকা উচিত। কায়েমী স্বার্থপর মানুষের লেখা ইতিহাসের ঘটনাগুলি পড়ে যদি তোমরা নিজেদের সম্বন্ধে এক ধারণা সৃষ্টি কর, তাহলে সেই ইতিহাস লেখক যে সমস্যাগুলিতে কষ্ট পাচ্ছিল তোমরাও সেই একই কষ্টে ভুগবে। খাদ্যগ্রহণ করার সময় তুমি কত সতর্ক থাক, কারণ সেই খাদ্য তোমার জীবনের অংশ হবে। একই প্রকার সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত যখন তুমি কোন ধারণা ভক্ষণ করতে যাও; যেমন বই পড়া, কোন তথ্য গ্রহণ করা। তোমাদের শিক্ষাকে অলাভজনক (নন-প্রফিট, ফর-প্রফিট) ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বাইরে হ’তে হবে। জ্ঞান নিঃশুল্ক। সেইজন্যই তোমাদের কাছে উপনিষদ এখন বিনামূল্যে উপলব্ধ। উপনিষদের সভ্যতাকে পুনরুদ্ধার করার একমাত্র উপায় হল - ইতিহাস যেন এমন মানুষেরা লেখে যাদের দৃষ্টি অকলুষিত। ভয় ও লোভ দ্বারা প্রভাবিত দৃষ্টি দেখা জিনিষকে বিকৃত করে ফেলে। বিকৃতভাবে লেখা সেই ঘটনা পড়ে তোমরা তা নিজেদের জীবনে আত্মভূত করা শুরু কর এবং সেই ইতিহাসবেত্তার ভয় ও লোভের একই সংস্কারগুলিকে নিজেদের জীবনে আত্মভূত কর। খাদ্য ও ওষুধে ভয় ও লোভ তোমার দেহকে অশুদ্ধ করে। ইতিহাস ও প্রাপ্ত ধারণাগুলিতে ভয় ও লোভ তোমার মনকে কলুষিত করে ফেলে। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ধারণাগুলিতে ভয় ও লোভ তোমার চেতনাকে বন্ধনে ফেলে। শারীরিক , বস্তুগত ও মানসিক কায়েমী স্বার্থ থেকে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতাকে সম্পূর্ণরূপে বাইরে রাখতে হবে। উপনিষদের কোন ঋষি কারো ভৃত্য বা বশং ছিলেন না। তাদের কোন কায়েমী স্বার্থ ছিল না অথবা কোন সংস্থার প্রতিপালন হেতু বা সেই সংস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোন ভাবাদর্শ ছিল না। এইরূপে কোন মানসিক বা বস্তুগত কায়েমী স্বার্থ না থাকার জন্য উপনিষদের ঐতিহ্য বিশুদ্ধ থেকে যায়। কোথাও ব্যক্তিগত প্রভাব ঢুকে পড়লে, তার শুদ্ধতা কম হয়। ব্যক্তি যত বেশী বিজড়িত, মানবতার জন্য তা ততই কম উপযোগী ও সত্য। এখন পর্যন্ত, মানবতা খুবই ব্যক্তিভিত্তিক, ব্যক্তিতান্ত্রিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক। উপনিষদ প্রথম লাইন থেকে, ভূমিকা থেকেই নিগূঢ় রহস্যময়। ‘অপৌরষেয়’, যার অর্থ প্রক্ষিপ্তকারহীন, কেবল এই একটি শব্দ দ্বারা তোমাদের সবার কাছে উপনিষদ উপস্থাপিত করা হল। কেন কোন লেখক নেই? কারণ এটাতে কোন কায়েমী স্বার্থের ছোঁয়া নেই। সেই স্বার্থগুলির নানা স্তর আছে : বস্তুগত স্তর - টাকাপয়সা। তারপর মানসিক স্তর - লোকেদের ইচ্ছামত প্রভাবিত ক’রে তাদের লীডার হওয়া। তারপর সমষ্টিগত মানসিক স্তর - কোন ভাবাদর্শকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জীবন্ত রাখার চেষ্টা ও মানবতাকে সেই ভাবাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং মানবতাকে সেই ভাবাদর্শ দ্বারা নিয়ন্ত্রণে ও বন্ধনে রাখা। উপনিষদ এই সব স্তরগুলির কলুষিতা থেকে মুক্ত। উপনিষদসমূহ হল অশুদ্ধতামুক্ত গ্রন্থ এবং সমস্ত মহাজগতের জ্ঞানের উৎস। কোন ব্যক্তিবিশেষ এতে জড়িত নেই, কোন ব্যক্তি এতে মহিমান্বিত হয় নি এবং কারো কোন কায়েমী স্বার্থ এতে বিদ্যমান নেই। ॥ অপৌরষেয় অপ্রমেয় অচিন্ত্য অনির্বচনীয় ॥ এর কোন গ্রন্থকার নেই, অপরিমেয়, অচিন্তনীয়, অবর্ণনীয় অপৌরষেয় অর্থাৎ গ্রন্থকার বিহীন। যে ঋষিরা এগুলি লিখে রেখেছেন, তাদের নাম রেকর্ড করা হয় নি কারণ সেই ঋষিদের কোন প্রভাবই উপনিষদ গ্রন্থে প্রকাশিত ভাবনাগুলিতে বা মহান সত্যগুলিতে নেই। তাই তা অপৌরষেয়। ব্রক্ষসুত্রের প্রথম শ্লোক হল : অথাতো ব্রক্ষজিজ্ঞাসা ॥ ১.১.১ ॥ এখন আমরা প্রকৃত সত্যের অন্বেষণ করি। এর অর্থ কোন কায়েমী স্বার্থ নেই, এটা কোন তত্ত্ব নয়, এমনকি ‘আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি’ এরূপ কোন অনুমানও নয়। ব্রক্ষসুত্র পাঠ করার পর শিষ্য নাস্তিক বা আস্তিক হওয়া পছন্দ করে নিতে পারে। এত সুবিশাল সম্ভাবনা। সম্ভাবনা ও মুক্তির উৎস থেকে জ্ঞানের প্রবাহিত হওয়া উচিত। কোন ভাবাদর্শ বা ধারণার প্রতি কায়েমী স্বার্থ বিনা উপনিষদের ঋষিদের অন্তর-আকাশ কত বিশুদ্ধ! সেইজন্য তাঁরা নিজেদের আধুনিকীকরণ ও নতুন করে আবিষ্কার করার জন্য এত প্রাণবন্ত ছিলেন। এই আধ্যাত্মিক সত্য গুলি লেখকদের কোন কায়েমী স্বার্থ বা ভয় বা লোভ দ্বারা প্রভাবিত নয়। সত্য গুলি প্রকাশিত করার সময় ভাবাদর্শের কত বিশুদ্ধতা প্রতিপালন করা হয়েছে! উপনিষদ এসেছে পরম সভ্য এবং সূক্ষ্মতম মস্তিষ্ক থেকে। যদি আমাদের সভ্যতা ভবিষ্যতে, কয়েক হাজার বছরে, পরিপক্কতা লাভ করে, তখন ধর্ম, ইতিহাস, তথ্য সম্প্রচার, এই তিনটি পুরোপুরি অনাভজনক ( নন্-প্রফিট) ব্যবস্থায় চলবে এবং ব্যক্তিবিশেষের ভয়, লোভ ও ভাবাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত থাকবে না। যখন সংস্থাগত অগ্রাধিকার চলে আসে ও বিবেচনাধীন হয়, তখন সত্যের সাথে আপোস করা হয়। ভয় ও লোভের হস্তক্ষেপ বিনা সেই শিক্ষাগুলির বিশুদ্ধতা বজায় রাখা হল একমাত্র উপায়, যার দ্বারা আমরা আমাদের কৃতজ্ঞতা, প্রেম, শ্রদ্ধা উৎসর্গ করতে পারি সেই মহান উপনিষদের ঋষিদের প্রতি, তাঁদের বিশুদ্ধতা, বলিদান ও উৎসর্জনের প্রতি। ঋষিগণ সত্যের বিশুদ্ধতা বজায় রেখেছিলেন কারণ সেটাই তো বিদ্যমান থাকার, শ্বাসপ্রশ্বাস নেবার, খাদ্য গ্রহণ করার, পোশাক পরিধান করার, চিত্তবিনোদন করার, জীবনের সুখ উপভোগ করার, চিন্তা করার, অনুভব করার সবচেয়ে উত্তম উপায়; অস্তিমান থাকার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় - সেটাই তো বিশুদ্ধ পথের উৎসে থাকা। উপনিষদের প্রথাতে ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক তত্ত্ব গুলির সম্পূর্ণ বিশুদ্ধতা প্রতিপালিত হয়। নিজেকে আশীর্বাদপুষ্ট অনুভব কর যে বৈদিক প্রথা আধ্যাত্মিক তত্ত্ব গুলিতে কোন বস্তুগত বা মানসিক কায়েমী স্বার্থ ছাড়া সর্বোত্তম বিশুদ্ধতা রেখেছে।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ পৃথিবীতে প্রথম ও সবচেয়ে প্রামাণিক গ্রন্থাবলী
পরিচ্ছেদ ৩ পৃথিবীতে প্রথম ও সবচেয়ে প্রামাণিক গ্রন্থাবলী উপনিষদসমূহ হল পৃথীগ্রহে লিখিত প্রথম গ্রন্থাবলী। যখন ঋষিরা অন্তর্ধান করেন, অস্তিত্ব মহাজাগতিক সত্যসকলকে অভিব্যক্ত করে। অপৌরষেয়ত্ব বা গ্রন্থকার বিহীনতা এই সত্যসকলের শক্তি প্রমাণ করে ও উপনিষদসমূহকে সর্বাধিক প্রামাণিক শাস্ত্র হিসাবে প্রকাশ করে 13 যে কোন সত্য, ধারণা, ধর্মতত্ত্বে যদি ব্যক্তিবিশেষ উপস্থিত থাকে, তবে তা কেবল সেই ব্যক্তিবিশেষের জন্য বেশী উপযোগী হয়; তা সবার জন্য, মানবতার জন্য, সমাজের জন্য অত উপযোগী নয়। ব্যক্তি যত কম উপস্থিত থাকবে, তত বেশী সত্য, ধারণা, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন সমস্ত মানবতার জন্য, সবার জন্য উপযোগী হবে। ব্যক্তির প্রভাব কেবল সমৃদ্ধকরণের জন্য হওয়া উচিত, কখনও সেই ব্যক্তির পরিচিতিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নয়। যুদ্ধে বিজয়ীরাই সদা ইতিহাস লিখেছে। সেইজন্য কোন ইতিহাস বাস্তব নয়, 'যেভাবে ঘটনাগুলি ঘটেছিল' - তা নয়। যখন কিছু নির্দিষ্ট ভাবাদর্শের ওপরে লেখকের নিজের কায়েমী স্বার্থ, ভয় ও লোভ থাকে না, কেবল তখন ইতিহাস বাস্তব ও পূর্ণ হয় এবং তা সমগ্র বিশ্বের জন্য ও সম্পূর্ণ মানবজাতির জন্য উপযোগী হয়। কোন কায়েমী স্বার্থ বিনা যে ইতিহাস লেখা হয় তাকে বলে পুরাণ। কায়েমী স্বার্থ সহকারে লিখিত ইতিহাসের চেয়ে পুরাণসমূহ অনেক বেশী বাস্তব। যে পুস্তকে লেখক বেশী করে উপস্থিত, সে পুস্তক পড়বে না। যদি গ্রন্থকার তার নিজের ভিতরে অন্তর্হিত হয়ে থাকেন এবং তাঁর কোন কায়েমী স্বার্থ, ভয় বা লোভ থাকে না, তাহলে সেই মানুষটিকেও অধ্যয়ন কর, কেবল তাঁর গ্রন্থই নয়। সেই ব্যক্তির জীবন অধ্যয়ন কর! তাঁর আশেপাশে থাক এবং শেখ, তুমি সত্য জানতে পারবে। যদি গ্রন্থকার তার নাম প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, সেখানে কলুষিতা আছে, কোন কারণ, কায়েমী স্বার্থ, ভয় বা লোভ আছে। কখন কখন লেখকেরা নিজের নাম ব্যবহার না করে কোন জনপ্রিয় নাম ব্যবহার করে, কারণ জনপ্রিয়তার দ্বারা তারা নিজেদের কাজগুলিকে সুরক্ষিত রাখতে চায়। কেবল যখন ব্যক্তি অনুপস্থিত, তার নিজস্ব কায়েমী স্বার্থ, ভয় ও লোভ অদৃশ্য হয়, দ্রবীভূত হয়ে যায়। সে তখন অস্তিত্বের নিজের বিদ্যমানতার গীত প্রকাশিত হওয়ার জন্য এক বিশুদ্ধ চ্যানেল হয়ে যায়। অপৌরষেয়ত্বা। উপনিষদ হল অস্তিত্বের নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে গান! নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে অস্তিত্বের গান! উপনিষদসমূহ এতই অসাধারণ যে কেউ তাতে মালিকানা ঘোষণা করতে পারে না। মানুষ মানবতার শুরু থেকে পৃথিবীগ্রহের চারিদিকে বহু নগর নির্মাণ করেছে। কিন্তু এত কিছু করার পরেও আমরা কি পৃথিবীগ্রহের ওপরে মালকা না দাবি করতে পারি? না! এতে মালিকানা দাবি করা করা এক বিশাল ব্যাপার। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও দুর্যোগগুলি হল বারংবার আমাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া প্রকৃতির ‘লীগাল নোটিস’, যা বলে, ‘কেবল যেহেতু তোমরা এতগুলি নগর নির্মাণ করেছ, তার মালিকানা দাবি করবে না’। উপনিষদে অভিব্যক্ত এই সত্যগুলি খুবই বিশাল। তোমার মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও তুমি তার মালিকানা দাবি করতে পার না। কোন একটি দেশে পৌঁছানোর সমুদ্রপথ আবিষ্কার করার জন্য সেই দেশের ওপরে মালিকানা করা তো এক বোকামি । যেহেতু তুমি আবিষ্কার করেছ যে পৃথিবী গোল, সেজন্য তুমি পৃথিবীর ওপরে মালিকানা দাবি করতে পার না। উপনিষদে অভিব্যক্ত সত্যগুলি খুবই বিস্তীর্ণ, বিশাল! ঋষিগণ উপনিষদের মালিকানা দাবি করেন নি, আবার তাঁরা লেখক হিসাবে তাঁদের নামগুলিও সেখানে রেখে যেতে ইচ্ছাপ্রকাশ করেন নি। সেই কয়েকজন মহাত্মা যাঁরা ব্রক্ষণের স্পন্দনে নিজেদের অনুরণিত করার জন্য উখিত করেছিলেন , তাঁরা তো সেই ব্রক্ষণের সাথে একীভূত হয়ে মিলিয়ে গেছেন! সেভাবে একীভূত হবার পরে তাঁরা যে সকল সত্য পেয়েছিলেন, যে সকল সত্য তাঁরা নিজেদের মধ্য দিয়ে অভিব্যক্ত করতে পেরেছিলেন, তা উপনিষদসমূহ হয়ে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। এই ঋষিগণ বুঝেছিলেন কেবল যখন তাঁরা নিজেরা মিলিয়ে যান, এই সত্যসকল প্রকাশিত হয়। তাই সেই সত্যসকলের মালিকানা না নেওয়ার এবং এমনকি গ্রন্থকার হবার দাবী না করার স্পষ্ট নির্নয় তাঁরা নিয়েছিলেন। যে গোয়ালা জীবিকা নিমিত্ত কয়েকটিমাত্র গরু নিয়ে এক ছোট গোশালা চালায়, যদি সে তার সমস্ত দুধ কোন বিগ্রহের অভিষেকের (পূণ্য স্থান) জন্য দান করে দেয়, সেটা সর্বোত্তম সমর্পণ; কারণ সেই দুধ ছিল তার সম্পূর্ণ জীবনের প্রচেষ্টার ফল। একইভাবে কোন লেখককে পক্ষে তার নাম ও গ্রন্থকারিতা বর্জন করা, নাম উল্লেখ না করা - অপৌরষেয়ত্ব - হল সর্বোত্তম সমর্পণ! যদি তুমি গ্রন্থকার হও, লেখক হও, তবেই এটা বুঝতে পারবে। আর উপনিষদের ঋষিরা এমন সুউচ্চ ধারণা অভিব্যক্ত করার পরেও নিজেদের নাম জানান নি। কোন ভুলিকনাও যদি উপনিষদসমূহ আত্মভূত করে, তা মহাদেব হয়ে উপবেশন করবে, তা মহাদেব হয়ে যাবে! কোন শব উপনিষদসমূহ আত্মভূত করলে, তা হয়ে যাবে শিব! তেজ, শক্তি, উৎসাহ, উদ্দীপনা, জীবন, জ্ঞান, আনন্দ, বুদ্ধিমতা - এসব তোমার মধ্যে উপনিষদসমূহ যেভাবে সঞ্চার করে তাতে যে কোন শব শিব হয়ে যাবে। এভাবে তুমি অথবা যে কোন ব্যক্তি মহাদেব, শিব হয়ে যেতে পারো। এই অপৌরষেয়ত্ব, গ্রন্থকার বিহীনতা উপনিষদসমূহকে সবচেয়ে প্রামাণিক শাস্ত্র বানিয়েছে। ইতিহাসবেত্তার ব্যক্তিগত স্বার্থ আদৃশ্য হলে , সেই ইতিহাস সত্য ও বাস্তব হয়। যখন বৈজ্ঞানিকের কায়েমী স্বার্থ থাকে না, বিজ্ঞান তখন সর্বজনীন ও উপযোগী হয়। বিজ্ঞানের গবেষণায় অনেক কিছুই বিজ্ঞানসম্মত নয়। এখন বেশির ভাগ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা -নিরীক্ষা ও গবেষণার উদ্দেশ্য হল কোন ভাবনা বা ধারণাকে প্রমাণিত করা যাতে সেই গবেষণায় যারা টাকা ঢেলেছে তাদের স্বার্থসিদ্ধি হয়। সিদ্ধান্ত আগেই ঠিক হয়ে আছে এবং তারপর হাইপোথেসিসকে খুঁটিয়ে না দেখেই গবেষণা করা হচ্ছে। সত্য গবেষণা, সত্য অন্বেষণে তো যে কোন হাইপোথেসিসকে খুঁটিয়ে দেখা উচিত। কায়েমী স্বার্থ প্রবেশ করলে সত্য বিনষ্ট হয়। সত্য কোথাও লক্ষ্য নয়। কদাচিৎ মানুষ আচমকা সত্য পেয়ে যায়। যদি তুমি সত্য জানতে চাও, তবে সেই সব বিজ্ঞানীদের কাছে যাও যাদের কেউ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অর্থ সাহায্য দেয় না। এই অপৌরষেয়ত্ব, প্রণবকার বিহীনতা, এই সত্যসকলের ক্ষমতাকে প্রামাণিকতা প্রদান করে, কারণ ঋষিগণ তাঁদের নাম প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কোনভাবেই আগ্রহী নন, লাভ বা অলাভজনিত আগ্রহের কথা তো ওঠেই না। সত্যের মহানতা দ্বারা অভিভূত হলেই বুঝতে পারবে তুমি সেই সত্যের মালিকানা নিতে পার না। তুমি জানবে যে সত্য তোমার চেয়ে অনেক বড়। তুমি সত্যের ওপরে দাঁড়িয়ে আছ, সত্য তোমার ওপরে নির্ভর ক’রে নেই। মহান ঋষিগণ আবিষ্কার করেন যে এই সত্যসকল সর্বজনীন, এই সত্যগুলিকে কোন ব্যক্তির সাথে চিহ্নিত ক’রে কলুষিত করা উচিত নয়। ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার মতামত সর্বদাই তার বলা কথাকে তুমি কিভাবে নেবে তা প্রভাবিত করে। স্বামী বিবেকানন্দ কথিত কিছু মহান সত্য বিশ্বজনীন ; কিন্তু যেই মুহূর্তে তুমি ঠিক কর যে ‘তিনি এক হিন্দু সন্ন্যাসী’, তুমি তাঁকে শোন না, সমগ্র বিশ্ব তাঁকে শোনে না, কেবল হিন্দুরা তাঁকে শোনে। কিছু মানুষ সম্প্রকে তোমার মতামত তোমায় বধির করে এবং তাঁদের অভিব্যক্ত মহান সত্যগুলি তুমি শুনতে পাও না। উপনিষদের ঋষিগণ এই প্রকর হানি চান নি, যে হানি লিখিত ধারণাগুলির ওপরে লেখকের ছবি ছেপে থাকার জন্য হয়। উপনিষদের ঋষিদের কি দারুণ মহানুভবতা ও তাঁদের সমর্পণের কি নিদারুণ নির্দশন! যদি তুমি কোন ব্যবসায়ীকে বল, 'তোমার মুখ কোাথাও দেখাতে হবে না, কিন্তু তুমি টাকা পেতে থাকবে', সে তা মানবে, কারণ টাকার জন্য সে অনেক কিছুই ছাড়তে খুশী হবে। কিন্তু খ্যাতি ও প্রচার দিয়েই তো সে তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বকে টাকা দ্বারাই বানিয়েছে। একইভাবে একজন নেতা টাকা ছাড়তে পারে প্রচার ও খ্যাতির জন্য, কারণ সে তার পুরো জীবনকে খ্যাতি ও প্রচার দিয়েই তৈরী করেছে। কিন্তু নেতা তার খ্যাতি ছাড়তে পারবে না। এক লেখক খাবার, ঘুম, টাকা সবকিছু ছাড়তে পারে, কিন্তু গ্রন্থকারিত্ব নয়, কারণ সে তার পুরো জীবন তো সেটা দিয়েই নির্মাণ করেছে। কিন্তু উপনিষদের গ্রন্থকারেরা মহত্তম। পৃথীগ্রহে লিখিত প্রথম গ্রন্থ হল উপনিষদসমূহ! প্রথম গ্রন্থের এঁরাই রচয়িতা। কি তাঁদের পরিপক্বতা! তাঁরা তো ত্যাগরাজা, ত্যাগের রাজা! যতদিন উপনিষদের ধারণাগুলি সজীব থাকবে, তা এই পৃথীগ্রহকে সজীব, অস্তিত্বমান রাখবে। তাই উপনিষদসমূহ কেবল প্রথম গ্রন্থই নয়, উপনিষদসমূহ পৃথিবীতে শেষ গ্রন্থও বটে, কারণ যতদিন এই সত্যসকল জীবিত থাকবে, পৃথিবীও টিকে থাকবে। এই সত্যসকল মুছে গেলে, পৃথিবীও শেষ হয়ে যাবে! মানবজাতির জঘন্য কর্মের পরেও যদি এই পৃথিবী টিকে যায়, তা কেবল এই উপনিষদের সত্যগুলিকে সজীব রাখার জন্য হবে, কারণ এই সত্যসকল কেবল পৃথীগ্রহের মানুষের কাছেই আছে, দেবতা ও অসুরদের কাছে নেই। এই সত্যসকল প্রাপ্ত ক'রে বিকিরণ করার জন্য কেবল মানুষ্যতন্ত্রই উপযোগী। বিজ্ঞান পূর্ণ হয় যখন বৈজ্ঞানিক বিজ্ঞানের সত্যে নিজেকে উৎসর্গ করেন। উপনিষদের ঋষিরা তার চরম উদাহরণ! তাঁরা সর্বাত্মক উৎকৃষ্ট সত্যধারী ও সর্বোচ্চ সিদ্ধির অধিকারী। ॐ ১৮ পরিচ্ছেদ 8 প্রথম ও প্রধানতম পবিত্র গ্রন্থাবলী বৈদিক প্রথায় উপনিষদসমূহ প্রথম ও প্রধানতম গ্রন্থাবলী। বৈদিক প্রথাই বিশ্বের প্রথম ও প্রধানতম প্রথা। উপনিষদের জীবনশৈলী ষড়দর্শন অর্থাৎ ছয়প্রকার মুক্ত চিন্তাধারার জন্ম দেয় যা থেকে পরে অগণ্য সম্প্রদায়, পরস্পরা, প্রথা ও ধর্মের জন্ম হয়।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ প্রথম ও প্রধানতম পবিত্র গ্রন্থাবলী
পৃথ্বীগ্রহে বৈদিক প্রথা হল সর্বপ্রথম ও প্রধানতম আধ্যাত্মিক প্রথা। একইভাবে উপনিষদসমূহ হল বৈ দিক প্রথার সর্বপ্রথম ও প্রধানতম গ্রন্থাবলী। উপনিষদ হল সমস্ত আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা, সমস্ত আধ্যাত্মিক চিন্তাশ্রোতের উৎস। বৈদিক প্রথায় আমরা মুক্ত চিন্তার জন্য ছয়টি উপায় গঠন করেছি। মুক্ত চিন্তা অর্থ , এমন এক চিন্তাশৈলী যা আমাদের সর্বদা সক্রিয়, উৎসাহী, প্রফুল্ল, নিজেকে নবতেজোদীপ্ত, স্বভাবত বুদ্ধিমত্তাশীল, জীবনের নিয়মের সাথে স্বাভাবিকভাবে সারিবদ্ধ এবং প্রকৃতগতভাবে আনন্দিত করে রাখে। তোমার আদি প্রকৃতি অনুযায়ী তুমি তো আনন্দময় , বুদ্ধিমতাশীল, সচেতন ও সজাগ। তোমাকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে তুমি সর্বাধিক সম্ভা বনা ও সর্বোচ্চ অস্তিতু অভিজ্ঞতা করতে পার। যে চিন্তাধারা তোমার সর্বাধিক সম্ভাবনাকে জাগ্রত করে, যা তোমার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত করে, যা তোমাকে পুরোপুরি সক্রিয় করে, ভরপুর আনন্দ প্রদান করে, সম্পূর্ণরূপে জাগ্রত করে, পূর্ণ সজীব রাখে, সেই চিন্তাধারাকে আমরা মুক্ত চিন্তাধারা বলছি। বৈদিক প্রথা দ্বারা নির্মিত ছয়টি মুক্ত চিন্তাধারা হল - সাংখ্য, যোগ, পূর্ব মীমাংসা, উত্তর মীমাংসা, ন্যায় ও বৈশেষিকা। এগুলি বৈদিক প্রথা সৃষ্ট প্রধান ছয়টি মুক্ত চিন্তাধারা। সাংখ্য : অস্তিত্ব, প্রকৃতি যে নিয়মাবলী দ্বারা কাজ করে ও যেসব নিয়মাবলী দ্বারা তা উৎস ও চেতনার সাথে যুক্ত; সেই নিয়মাবলীকে বোঝা এবং তার সাথে নিজেকে সারিবদ্ধ করা এবং এদের মাধ্যমে মুক্ত চিন্তা করা হল সাংখ্য। যোগ : তুমি যাকে 'তুমি' বলে চিন্তা কর, তোমার দেহ ও মন - এই দুইটিকে অস্তিত্বের সাথে সুর বাঁধা ও সারিবদ্ধ করা, তার মাধ্যমে পরম পূর্ণতা, পরিপূর্ণতা, জ্ঞান, উৎফুল্লতা, সক্রিয়তা, অস্তিত্ব, আনন্দানুভূতি অভিজ্ঞতা করা, এই মুক্ত চিন্তাধারাকে বলা হয় যোগ। পূর্ব মীমাংসা : তোমার কার্যের মাধ্যমে মহাজগতের নানাপ্রকার শক্তির সাথে সারিবদ্ধ হওয়া এবং পরমকে অভিজ্ঞতা করা, জীবনমুক্তি, পরিপূর্ণতা ও পূর্ণত্ব অভিজ্ঞতা করা - এই প্রকার মুক্ত চিন্তাধারার অভিজ্ঞতা হল পূর্ব মীমাংসা (কর্মকাণ্ড)। উত্তর মীমাংসা : কেবল তোমার বুদ্ধিকে জীব-ঈশ্বর-জগৎ, এই তিনের সাথে সারিবদ্ধ করা এবং মুক্ত চিত্তা সহকারে জীবনযাপন করা হল উত্তর মীমাংসা (বেদান্ত)। ন্যায় : যুক্তি দ্বারা কেবল ভাগ করতে করতে, বিশ্লেষণ করতে করতে বোঝা এবং মুক্ত চিন্তা করা হল ন্যায়। বৈশেষিকা : সংযুক্ত করতে করতে, অন্তর্ভুক্ত করতে করতে অভিজ্ঞতা করা ও তার মাধ্যমে মুক্ত চিন্তা করা হল বৈশেষিকা। সাংখ্য, যোগ, পূর্ব মীমাংসা, উত্তর মীমাংসা, ন্যায় ও বৈশেষিকা - বৈদিক প্রথা থেকে আসা এই ছয়টি মুক্ত চিন্তাধারা, মুক্ত চিন্তাশোতের প্রতিটি স্বতন্ত্রভাবে তোমাকে মুক্ত চিন্তার সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য পূর্ণ। যদি তুমি সাংখ্য অভ্যাস কর, তোমার যোগ বা অন্যান্য মুক্তচিন্তাধারা থেকে কোন সাহায্যের প্রয়োজন নেই। তুমি এখন যেখানে আছ সেখান থেকে তোমার যেখানে যাওয়া উচিত, তার জন্য সাংখ্যই যথেষ্ট। তুমি যেখানেই থাক না কেন, তা তোমার কাছে পৌঁছে যাবে এবং তোমার যেখানে যাবার কথা সেখানে নিয়ে যাবে। এটা স্বাধীন, বুদ্ধিসম্পন্ন, যথেষ্ট স্বতন্ত্র চিন্তাধারা, যার মাধ্যমে তুমি মুক্তচিন্তা অভিজ্ঞতা করতে পার। সাংখ্যের স্বতন্ত্র বুদ্ধিমত্তা আছে এবং তুমি যেখানে আছ সেখান থেকে তোমার যেখানে যাওয়ার কথা সেখানে নিয়ে যাবার জন্য সাংখ্য একাই সক্ষম। সাংখ্য অভ্যাস করলে তোমাকে অন্য কোন চিন্তাধারা অভ্যাস করার দরকার নেই। উপনিষদসমূহ, সমস্ত মুক্তচিন্তাধারাগুলি বা দর্শনের উৎস। আমরা মুক্তচিন্তাধারাকে সংস্কৃততে বলি দর্শন, উপলব্ধি করার সামর্থ্য। ‘দর্শন’কে ইংরাজীতে ‘ফিলোসফি’ (philosophy) অনুবাদ করা যায় না। ফিলোসফি খুবই দুর্বল, অপভীর শব্দ। আমি একটা নতুন শব্দ ব্যবহার করব - ফিলোসিয়া (philosia), দেখার এক নতুন সম্পাবনা। বৈদিক প্রথা যে ষড় দর্শন বা ছয়টি ফিলোসোফিয়া নির্মাণ করেছে, তার সব কয়টি উপনিষদসমূহ থেকেই এসেছে। উপনিষদ হল মাতা যিনি ষড় দর্শনের জন্ম দিয়েছেন। প্রতিটি চিন্তাধারা, প্রতিটি মুক্তচিন্তার দ্বারা হাজার হাজার সম্প্রদায়, পরস্পরার জন্ম দিয়েছে, যেগুলির প্রত্যেকটি পাশ্চাত্য অভ্যাস অনুযায়ী একেকটি ধর্ম (religion) শব্দের সমতুল্য। তোমরা পাশ্চাত্য জগতে রিলিজিয়ন (religion) বলতে যা বুঝেছ, সংস্কৃতে তার সমতুল্য শব্দ হল সম্প্রদায় (Order); কারণ সনাতন ধর্ম বা বৈদিক প্রথা হল মূল ছয়টি চিন্তাধারার মাতা এবং তাঁর থেকেই সমস্ত রিলিজিয়নের জন্ম হয়েছে। সেইজন্যই বৈদিক প্রথা বা হিন্দুয়িজম-কে (Hinduism) ‘রিলিজিয়ন’ নামের এক ছোট ফ্রেমে ধরে রাখা যায় না। এটা খুবই ছোট একটি ফ্রেম কারণ প্রতিটি রিলিজিয়ন একটি জীবনশৈলী। বৈদিক প্রথা, উপনিষদের জীবনশৈলী, ছয়টি মুক্ত চিন্তাধারা বা ষড় দর্শনের জন্ম দিয়েছে; আবার ষড় দর্শন থেকে পালাক্রমে অসংখ্য সম্প্রদায়, পরস্পরা, প্রথা ও ধর্মের জন্ম হয়। উপনিষদসমূহ এত বিস্তীর্ণ যে তাদের কোন একটি রিলিজিয়নে রাখা যায় না। সর্বোত্তম সমস্ত চিন্তাধারা , সর্বোত্তম মুক্ত চিন্তাধারার উৎস হল উপনিষদ। অস্তিমান থাকার প্রণালী, নানা বৈচিত্র্যের পছন্দ সহকারে বাস করার পদ্ধতি এবং সম্ভাবনাগুলিকে উপনিষদ অভিব্যক্ত করে। এইরূপ নানা পছন্দ (choice) গভীরতা প্রমাণ করে, বিভ্রান্তি নয়। বেদমাতার মহিমা দেখ! তিনি কি ভাবে মানবতার জন্য দাঁড়িয়েছেন, মানব চৈতন্যের জন্য তাঁর কত অবদান। আজ পৃথিবীতে তোমরা যা কিছু দেখ , যা তুমি কর, উদ্যাপন কর, তা বেদমাতার অবদান। এগুলি তার দেওয়া উপহার। গণিতশাস্ত্র, জ্যোতিষ, জ্যোতিরবিজ্ঞান, শরীরবিদ্যা যে কোন শব্দই তুমি ব্যবহার কর না কেন, সমস্ত চিন্তার স্রোত, চিন্তাধারা, যা কিছু ভাল তুমি দেখ ও শোন, তা বেদমাতা প্রদত্ত উপহার - উপনিষদ থেকে আসা চিন্তাধারার উপহার। উপনিষদসমূহ হল বৈদিক প্রথার সর্বোত্তম গ্রন্থ। বৈদিক প্রথার পবিত্র শাস্ত্রগুলির মধ্যে উপনিষদসমূহকে সর্বোচ্চ শিখরে রাখা হয়েছে এবং তা অ-বিতর্কিত। সকল সম্প্রদায়, ষড় দর্শন - সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিকা, উত্তর মীমাংসা, পূর্ব মীমাংসা - এই ছয়টি মুক্তচিন্তাধারার প্রতিটি উপনিষদসমূহকে চূড়ান্ত, প্রথম ও অগ্রণী গ্রন্থ ব'লে স্বীকার করে। ইতিহাসবেত্তারা উপনিষদসমূহকে একটি রিলিজিয়নের (ধর্মের) ফ্রেমে শ্রেণীভুক্ত করে বিরাট ভুল করেছে। আধুনিক কালে তারা এগুলিকে বৈদিক প্রথাতে ডুবিয়ে তাকে হিন্দুধর্ম বলে বর্ণনা করে। যদি আমরা উপনিষদসমূহকে কোন এক বিশেষ রিলিজিয়নে শ্রেণীভুক্ত করি, তাহলে আমরা উপনিষদসমূহের গরিমা ও সম্ভাবনাকে অশ্রদ্ধা করব। প্রথমত উপনিষদসমূহকে শ্রেণীভুক্ত করা যায় না। যদিবা তাদের শ্রেণীভুক্ত করতে হয়, আমি তাদের শ্রেণীভুক্ত করব এই বলে - সমস্ত মুক্তচিন্তাধারার উৎস, মানুষজাতিকে উচ্চতর স্তরে বিকশিত করাবার উপযোগী সমস্ত জীবনশৈলীর উৎস। যেহেতু উপনিষদসমূহ সকল মুক্তচিন্তাধারার উৎস এবং মানুষকে বিকশিত করে, তাই সুস্পষ্টরূপে উপনিষদসমূহ প্রথম ও অগ্রণী ঐশ্বরিক গ্রন্থাবলী। উপনিষদসমূহ হল, অস্তিত্ব নিজেকে নিজের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে ও উদযাপন করছে, অস্তিত্ব নিজেকে প্রদর্শন করাচ্ছে কিভাবে নিজসত্তা হওয়া যায়। উপনিষদের প্রতিটি শ্লোক একেকটি মুক্তচিন্তাধারার জন্ম দেয় এবং যা পালাক্রমে অসংখ্য মানুষকে মুক্ত করে । উপনিষদসমূহ হল প্রথম ও অগ্রণী ঐশ্বরিক গ্রন্থাবলী যার ও পরে ভিত্তি ক'রে তোমার জীবনশৈলীকে সারিবদ্ধ করা উচিত। উপনিষদসমূহ বারংবার পাঠ ক'রে বুঝে তাদের আত্মভূত ও উপলব্ধি ক'রে তার আদর্শে জীবনযাপন করা উচিত, আমাদের মাধ্যমে তাদের বিকিরণ ক'রে প্রচার করা উচিত ও পূজা করা উচিত। উপনিষদসমূহ হল পবিত্রতম আদি সত্যসকল। ॐ পরিচ্ছেদ ৫ মহাজগতের নিজের কাছে স্পন্দনময় প্রকাশ উপনিষদ অর্থ কেবলমাত্র উপবেশন করা (বসে থাকা)। উপবেশন করলে সত্য প্রকাশিত হয়। যখন ঋষিগণ মন্ত্রদ্রষ্টা হয়ে সমাধিতে উপবেশন করলেন, তখন তাঁদের সত্তায় মহাজাগতিক পবিত্র সত্যসকলের স্পন্দন শুরু হয়। এই অভিব্যক্তি হল উপনিষদসমূহ।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ নিজের কাছে মহাজগতের স্পন্দনময় প্রকাশ
যেভাবে উপনিষদসমূহ তোমাকে 'তোমার' কাছে উপস্থাপিত করে, যেভাবে তারা বিশ্বকে 'তোমার' কাছে উপস্থাপিত করে, যেভাবে তারা 'তোমার' কাছে ঈশ্বরকে উপস্থাপিত করে, যেভাবে তারা 'তোমার' কাছে জীবনকে উপস্থাপিত করে, তার কোন তুলনাই অন্য কিছুর সাথে হয় না। উপনিষদসমূহ প্রদত্ত বিষয়বস্তুর বিশুদ্ধতা বা তাদের কবিতাশৈলী অথবা কেবল ধ্বনিগুলি যার মধ্যে কুণ্ডলিনী জাগরণের স্পন্দন সুন্দরভাবে নিহিত করা হয়েছে - সবই ঐশ্বরিক অবদান। কেবল ভাষাবিদ্যাগত ও কাব্যিক গুরুত্ব নয়, উপনিষদসমূহের ধ্বনিগত গুরুত্বও প্রচুর। ধর্মের ইতিহাসবেত্তারা উপনিষদসমূহকে হিন্দুধর্মে শ্রেণীভুক্ত ক'রে হিন্দুধর্মের প্রতি অনেক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছে। অবশ্যই হিন্দুরা এর উত্তরাধিকারী কিন্তু হিন্দুদের উপনিষদ অনুযায়ী জীবনযাপন করা উচিত ও সমগ্র বিশ্বের সাথে শেয়ার করা উচিত। আমরা এর উত্তরাধিকারী, কিন্তু কেবল আমরা এর অধিকারী নই, সমগ্র বিশ্ববাসীও এর অধিকারী! উপনিষদ অর্থ উপবেশন করা (বসা), ব্যাস। যখন তুমি বস, যখন 'তুমি' উপবেশন কর - আমি তোমার দেহের বসে থাকার কথা বলছি না, আমি বলছি যখন 'তুমি' বসো, সত্য প্রকাশিত হয়। একমাত্র সঠিক প্রসঙ্গ থেকে উপনিষদসমূহের শিক্ষা প্রদান করা উচিত। উপনিষদসমূহ! যখন ঋষিগণ তাঁদের মধ্যে সমাধিতে উপবেশন করলেন, তাঁদের সম্পূর্ণ সত্তা পবিত্র সত্যসকলের সাথে স্পন্দিত, অনুরণিত হতে শুরু করল। মহাজগৎ তাঁদের মধ্যে দিয়ে গাইতে লাগল ও বিকিরণ করতে লাগল। এই অভিব্যক্তিই উপনিষদসমূহ। সেইজন্যই সংস্কৃতে আমাদের 'ঋষি'র সত্তা দিই, মন্ত্রদ্রষ্টা - 'যাঁরা মন্ত্রকে দেখতে পান'; 'যাঁরা মন্ত্র লেখেন বা শোনেন' নয়। তাঁর অর্থ যখন তোমরা অভিজ্ঞতা করছ, তখন ধ্বনিগুলিও চক্ষু দ্বারা অনুভূত হবে। যদি ধ্বনি কান দিয়ে শোনা হয়, তুমি শুনছ। যদি ধ্বনিকে পাঁচটি ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত কর, তবে তুমি অভিজ্ঞতা করছ। তাই ধ্বনি দৃশ্যমান হলে মন্ত্র দেখা যায়। যখন তোমার চক্ষু ধ্বনি অভিজ্ঞতা করে, যে রেখাগুলি তুমি অভিজ্ঞতা কর তাদের বলে 'অক্ষর'। আমাদের ঋষিগণ প্রতিটি ধ্বনি বা শব্দ অভিজ্ঞতা করেছেন। 'অ'; যখন তাঁরা এই ধ্বনি অভিজ্ঞতা করেন, যে রেখার মাধ্যমে তাঁদের চক্ষু সেই ধ্বনি অভিজ্ঞতা করে, সেই রেখা হয়ে যায় অক্ষর। তাঁরা অত্যন্ত বিকশিত ছিলেন, একদম দুশ্চিন্তামুক্ত ছিলেন, বেঁচে থাকার জন্য সমস্ত আবশ্যক বস্ত্রের প্রাচুর্য ছিল এবং তাঁরা এক সুউচ্চ স্তরে বাস করতেন। তা ছিল কতই না সুন্দর! গঙ্গা নদীর জন্য উপনিষদসমূহ সম্ভব হয়। গঙ্গামাতা গাঙ্গেয় উপত্যকাকে কতই না সমৃদ্ধ করেছেন! মৌলিক সমস্ত আবশ্যকতা তিনি পূরণ করেছেন। সৌভাগ্যবশত, কোন যুদ্ধ হয় নি এবং বেঁচে থাকার জন্য ঋষিদের লড়াই করার কোন প্রয়োজন ছিল না। সকল প্রাকৃতিক শক্তিগুলি সহায় ক ছিল, যাবতীয় প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা হয়েছিল। সেই পরিবেশ, সেই আকাশ তাঁদের জন্য এক চমৎকার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল উপবেশন করার - নিজের সাথে, ব্রক্ষ্মাণ্ডের সাথে, প্রকৃতির সাথে। অস্তিত্ব নিজের সম্বন্ধে তাঁদের মাধ্যমে গান গাওয়া আরম্ভ করেছিল। প্রতিটি উপনিষদের প্রেক্ষাপটের বিন্যাস আলাদা, কিন্তু তাদের দ্বারা বিকিরিত সত্যসকল কট সুন্দরভাবে সমলয়ে আছে। একটি ব্রহ্মাণ্ডের সত্য অনাবৃত করছে , একটি মানুষের সত্য প্রকাশিত করছে, আরেকটি মৃত্যুর সত্যের রহস্যভেদ করছে, অন্যটি জীবন সম্পর্কে সত্য অভিব্যক্ত করছে। যেন তোমার সমস্ত প্রশ্নগুলিকে মুছে ফেলা হচ্ছে এবং তুমি আছ মহাজগতের চেতনায়, আর সম্পূর্ণ মহাজগৎ আছে তোমার চেতনাতে। মহাজাগতিক চেতনা! যখন তোমার চেতনায় মহাজগৎ আছে, তুমি মহাজগতের চেতনায় থাক। মহাজাগতিক চৈতন্য! মানুষকে মহাজাগতিক চেতনায় নিয়ে আসার জন্য যা কিছু বোধ প্রয়োজন , তা সবই সুন্দরভাবে প্রকাশিত ও পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য সমস্ত সন্দেহের উত্তর দেওয়া হয়েছে। তাই উপনিষসমূহে সমগ্র বিশ্বের অধিকার আছে। এগুলি আমাদের কাছে থাকলেও তা প্রকৃতপক্ষে সারা বিশ্বের। আম রা উপনিষদসমূহের উত্তরাধিকারী হতে পারি, কিন্তু তার মালিকানা সমগ্র বিশ্বের। যারাই মায়া ও বিভ্রমে কষ্ট পাচ্ছে, তাদেরকে উপনিষদ প্রদান করা উচিত, তাদের সাথে আমাদের উপনিষদ শেয়ার করা উচিত। উপনিষদসমূহের প্রতিটি ধ্বনি, প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি পংক্তি এক শক্তিশালী চেতনা সহকারে স্পন্দমান। শক্তিশালী চেতনা! এখনও উপনিষদসমূহ ভারতবর্ষকে সজীব রেখেছে। উপনিষদসমূহই ভারতের মেরুদণ্ড, ভারতের ধারণা। আমাদের সমস্ত আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা ও উপলব্ধিগুলি একসাথে হল উপনিষদসমূহ। উপনিষদসমূহ হল কটি কটি মানুষের লাখ লাখ বছরের আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মূর্তপ্রকাশ। উপনিষদসমূহের ভাষ্য, টীকা বা সম্পাদনা (editing) সম্ভব নয় উপনিষদে অনুক্ত বা অপ্রকাশিত কিছুই নেই; তাতে একটা শব্দও অনাবশ্যক নয়। তুমি তাদের সম্পাদনা (এডিটিং) করতে পার না, আবার তার ওপরে টীকা বা ভাষ্যও লিখতে পার না। ভাষ্য অর্থ কিছু জিনিষ অকথিত থেকে গেছে; তোমাকে তার ব্যাখ্যা করতে হবে। এডিটিং মানে অতিরিক্ত বা অনাবশ্যক কিছু শনাক্ত করা। এডিটিং সম্ভব নয়, আবার তার কোন অনুমতিও নেই। ভাষ্য করার অনুমতি আছে, কিন্তু কার্যকরীভাবে সম্ভব নয়, কারণ অবাখ্যত কিছুই সেখানে নেই। সমস্ত ভাষ্য, তা সে শংকরাচার্য হোন কি রামানুজ বা মাধবাচার্য হোন, সবই একই ধারণাগুলির পুনরাবৃত্তি, তাঁরা কেবল পছন্দের ধারণাগুলিকে সবার দৃষ্টিতে নিয়ে এসেছেন, হাইলাইট করেছেন। হাইলাইট করা হয়ত সম্ভব, কিন্তু ভাষ্য করা নয়; কারণ উপনিষদসমূহে অব্যক্ত কিছুই নেই। উপনিষদের ভাষ্য করা সম্ভব নয়। ধর্ম অনুযায়ী তার অনুমতি আছে, কিন্তু সম্ভব নয়। এডিটিং (সম্পাদনা) সম্ভব নয় এবং তার অনুমতিও নেই। সমস্ত আচার্য্যেরা (আধ্যাত্মিক শিক্ষক), এমনকি যারা হিন্দুধর্ম স্বীকার করে না, তারাও ‘এডিটিং করা হবে না’ এই মৌলিক নৈতিকতা স্বীকার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, রামানুজাচার্য্য উপনিষদের কিছু অনুচ্ছেদ হয়ত স্বীকার করেন নি, কিন্তু তিনি কোন এডিটিং করেন নি। একইভাবে চার্বাক, এক বস্তুবাদী, কিছু শ্লোক হয়ত গ্রহণ করতে পারে নি, কিন্তু কোথাও এডিট করেন নি। এমনকি বৌদ্ধরাও একটি উপনিষদ স্বীকার করে - মহানির্ৱাণ উপনিষদ - কিন্তু অন্যান্যগুলিকে স্বীকার করে না, এমনকি তারাও কখন কোন এডিটিং করে নি। তোমরা দেখতে পাবে, যে কোন বৌদ্ধ বিহার বা বিশ্ববিদ্যালয়ে তালপত্রগুলি হিন্দু মঠের মতই শ্রদ্ধা সহকারে রাখা আছে। আদি লেখনে কোন প্রকার বিভ্রান্তির অবকাশ নেই; কোন এডিটিং নেই, নিজ উদ্দেশ্য সাধনের কোন ব্যাপার নেই, কোন বিকৃতি নেই। একইভাবে যদি শংকরমঠের (হিন্দুদের) বৌদ্ধসূত্র সম্বলিত তালপত্রের সংরক্ষণাগারে গিয়ে দেখ, সেগুলিকে পূরোপুরি সত্য অবলম্বন ক’রে সংরক্ষিত দেখতে পাবে। তারা হযত বৌদ্ধধর্ম স্বীকার করে না, কিন্তু কেউ নিজের উদ্দেশ্যসাধনের জন্য হস্তক্ষেপ ক’রে তাতে কোন শব্দ প্রবেশ করানো বা মুছে দেওয়ার সাহস করবে না। এই মহান ভারতীয় সংস্কৃতি, জীবনশৈলী ও প্রথাতে তুমি যে সমস্ত পুস্তক স্বীকার কর না, তুমি তাদের পরিবর্তন, এডিট অথবা বিকৃত কর না। কি সুন্দর সততা ও সাধুতা! কল্পনাতীত সাধুতা এবং বাণী (বাক্) বা মাতা সরস্বতীর প্রতি শ্রদ্ধা! সরস্বতী হলেন পবিত্র কণ্ঠস্বরের দেবী (বাক্দেবী, বাগ্দেবী)। বৈদিক প্রথার, হিন্দু প্রথার ও ভারতবর্ষের জীবনরেখা এই উপনিষদসমূহকে তো কেবলমাত্র স্মরণ করেও মহানন্দ পাওয়া যায়। মহাজাগতিক চৈতন্য! যখন তোমার চেতনায় মহাজগৎ থাকে, তখন মহাজগতের চেতনাতে তুমি থাক। ॐ পরিচ্ছেদ ৬ একমাত্র উপনিষদসমূহই অবতার সৃষ্টি করে যে কোন আধ্যাত্মিক পুস্তক তোমাকে সত্যে নিমজ্জিত হবার জন্য উদ্দীপনা দিতে পারে; কিন্তু মহাজগৎকে তোমার মধ্যে নিমজ্জিত হবার উদ্দীপনা কেবল উপনিষদসমূহই দিতে পারে। তাই অবতার ঘটে ভারতে যে পবিত্র দেশের শ্বাসপ্রশ্বাসই হল উপনিষদসমূহ। যখন তুমি ভয় অনুভব কর, কোন কিছুর দ্বারা আতঙ্কিত হও, সেই উত্তেজনায় তুমি সেই পরিস্থিতিকে নিজের প্রচেষ্টায় পরিবর্তিত করার প্রয়াস কর ; তা হল যোগ। আর তুমি সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করার চেষ্টা কর ও সেই বুদ্ধিকে হস্তক্ষেপ করে তোমাকে রক্ষা করতে অনুরোধ কর , সেটা হল ভক্তি। কখনও তোমার হানি করা যায় না, এটা জেনে প্রকৃত ঐশ্বত-আকাশে অবস্থান করা, স্বতঃচলভাবে তথাকথিত সমস্ত ভয় ও আতঙ্ক মুছে ফেলা হল ঐশ্বত জীবন। উপনিষদসমূহ ঐশ্বত জীবন অভিব্যক্ত করে। উপনিষদের নানা ব্যাখ্যা উপনিষদসমূহের পবিত্রতা ও মৌলিকত্ব সরিয়ে ফেলে না। কখনও কখনও মানুষেরা হিন্দুধর্মের মধ্যে লড়াই এবং মতভেদের সম্বন্ধে প্রশ্ন করে, 'এমনকি শংকরাচার্য, রামানুজাচার্য, মাধবাচার্যের মত মাষ্টারদের মধ্যেও অনেক মতভেদ ছিল। সর্বোচ্চ স্তরের আচার্যরা পরস্পরের সাথে সমমলয়ে নেই। তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ কিভাবে কিছু বুঝতে পারব? কোনটাকে সঠিক ব'লে স্বীকার করব?' এক বৈজ্ঞানিক কিছু আবিষ্কার করে এবং সে নোবেল পুরস্কার পায়। কয়েক বছরের মধ্যে আরেকজন বৈজ্ঞানিক আগের বৈজ্ঞানিককে খণ্ডন করে এবং সে ও নোবেল পুরস্কার পায়। তার অর্থ এই নয় যে তাদের মধ্যে মতভেদ আছে। সত্যকে এখন অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকাশিত করা হল। তার অর্থ এই নয় যে প্রথম বিজ্ঞানীর আবিষ্কার ভুল ছিল। প্রকৃতপক্ষে প্রথম আবিষ্কারের জন্য, আর যেভাবে প্রথম বিজ্ঞানী আমাদের উখিত করেছিল, সেজন্য দ্বিতীয় আবিষ্কার সম্ভব হল। জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতামত অর্থ নানা চিন্তাধারা এবং একাধিক পছন্দ। অবাক করা স্বাধীনতা! অবাক করা সম্ভাবনা! সকলে নিজের মত ক'রে থেঁজে, নিজের মত ক'রে প্রকাশ করে। আর তুমি শংকরাচার্য পাঠ ও আত্মভূত করার
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ একমাত্র উপনিষদসমূহই অবতার সৃষ্টি করে
পরেও তুমি কখনও শংকরাচার্যের অনুগামী হবে না; তুমি কেবল শংকরাচার্যের একটি প্রকাশ হবে। তাই শৈবদের একটি সুন্দর শব্দ আছে - শিবগণ, যারা শিবের ভাবমূর্তি। তুমি অবিরত শিবোহম্ চেতনাতে থেকে শিবোহম্ বিকিরণ করতে থাক, তুমি শিবের অনুগামী হবে না, তুমি শিবের মূর্তপ্রকাশ, শিবগণে হয়ে যাবে। গণ অর্থ, যে ভাবনার বাস্তবরূপ প্রদান করে, যে পরিপূর্ণ। তাই উপনিষদের ওপরে মতভেদ ও ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য যেন তোমাকে উপনিষদ থেকে দূরে না সরিয়ে নেয়, বরং এজন্য তোমার মূল উপনিষদসমূহ পাঠ করার জন্য অনুপ্রাণিত হওয়া উচিত। আমাদের হযর হাজার হাজার মতামত ও ধারণা আছে, কিন্তু কেউই উপনিষদসমূহের সাধুতাকে, তাদের প্রামাণিকতাকে, তাদের কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করে না। সেখানেই সবাই একত্র হয়, একসাথে হয়। প্রতিটি বিজ্ঞানীর হযর নানা অভিমত, বিভিন্ন তত্ত্ব ও গবেষণাসমূহক মতামত আছে, কিন্তু তারা সবাই বিজ্ঞানের আত্মাকে স্বীকার করে চলে। একইভাবে, প্রত্যেক মাস্টারের হযর আলাদা ধারণা, ভিন্ন তত্ত্ব ও নীতি আছে, কিন্তু তাঁরা সকলে উপনিষদসমূহের আত্মাকে স্বীকার করেন। উপনিষদসমূহকে যত বেশী পাঠ করবে, বারবার পড়বে, বুঝবে ও আত্মভূত করবে, ততই তুমি অন্তর থেকে সুন্দর হবে; ততই তা তোমার অন্তর্দেশকে সুন্দর করবে। প্রতিটি সত্য যা তোমাকে মহাজাগতিক চেতনাতে পৌঁছে দেয়, তা মহাজগৎকে তোমার চেতনাতে টেনে আনে। ব্রক্ষাওকে পিণ্ডাওে প্রবেশ করতে হবে এবং পিণ্ডাওকে প্রবেশ করতে হবে ব্রক্ষাওে। ব্রক্ষাও (macrocosm) হল নিখিল জগৎ, আর পিণ্ডাও (microcosm) হল ক্ষুদ্র জগৎ, মানুষ। ব্রক্ষাওকে পিণ্ডাওের অংশ হতে হবে, আর পিণ্ডাওকে ব্রক্ষাওের অংশ হয়ে যেতে হবে। কেবল বিন্দু মহাসাগরে মিলিয়ে গেলে হবে না, মহাসাগরকে বিন্দুতে মিশে যেতে হবে। বিন্দুর মহাসাগরে মিশে যাওয়া হল জীবনমুক্তি (Enlightenment)। যখন মহাসাগর বিন্দুতে মিশে যায়, তিনি এক অবতার (Incarnation)। উপনিষদসমূহ বারবার, বারংবার পাঠ কর, তোমার অন্তর্দেশ সুন্দর হবে। একবার পাঠ করলে ও বুঝতে পারলে, তুমি সেই ধারণাতে মিশে যাও। কিন্তু বারংবার পাঠ ক'রলে সেই ধারণা তোমার মধ্যে মিশে যায়। কেবল যখন ধারণা তোমার মধ্যে মিশে যায়, তুমি সুরক্ষিত হও যে তুমি তা ভুলে যাবে না, তা তোমার জীবনে হারিয়ে যাবে না; তা তোমার অংশ হয়ে যাবে। পিপাসিতের বৃক্ষাতেও যাওয়া হল জীবনমুক্তি। বৃক্ষাত্ত্ব পিপাসিত হলেই তা হয় অবতারাী। তোমার মহাজাগতিক চেতন্য হয়েছে এবং মহাজগতের চেতন্যে তুমি আছ। তোমার মহান সত্যসকলে মিশে যাওয়া এবং মহান সত্যসকলের তোমাতে মিশে যাওয়া; দুটো পুরোপুরি ভিন্ন। উপনিষদসমূহ সহকারে মহান সত্যগুলি তোমাকে কেবল সেগুলিতে দ্রবীভূত হতে উদ্দীপ্ত করবে, তা নয়, এমনকি সেগুলিও তোমার মধ্যে দ্রবীভূত হয়ে যাবে। যে কোন ধর্মগ্রন্থ অথবা মহাপুরুষ লিখিত কিছু শ্লোকের পাঠ তোমার সত্তাকে সত্যসকলে মিশে যাবার জন্য উদ্দীপ্ত করতে পারে। সেটাকে বৈদিক প্রথার মহান ভক্ত বৃন্দ ও সাধুগণ, মীরা, জ্ঞানসম্বন্দর, মাণিক্কবাসাগর, রামদাস, চৈতন্য মহাপ্রভু, এনারা বলেন 'ভক্তি'। তাঁরা সবাই মহাজগতের সাথে মিশে যাবার জন্য ভাব ও আবেগের প্রবলতাকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করেন। তোমাকে সত্যে মিশে যাবার জন্য উদ্দীপ্ত করতে যে কোন ধর্মগ্রন্থই পারে; কিন্তু মহাজগতকে তোমার মধ্যে মিশে যাবার জন্য অধীর করতে কেবল উপনিষদসমূহই পারে। কেবল উপনষসমূহ তোমাকে সেই উচ্চতায় উখিত করতে পারে - তুমি এত বিস্তীর্ণ হয়ে যাও যে মহাজগৎ তোমার মধ্যে মিশে যায়। পীঠস্থ এত বড় হয়ে যায় যে তাতে বৃক্ষাঙ্ক তাতে দ্বিভূত হয়ে যেতে পারে। পুরো বৃক্ষাঙ্ককে তোমার মুখের মধ্যে পাওয়ার জন্য, তোমার মুখটিকে সম্পূর্ণ বৃক্ষাঙ্কের আকারে হয়ে খুলতে হবে। সত্যকে তোমার মধ্যে মিশে যাবার জন্য তোমাকে তো সত্যতির থকে দীর্ঘকায় হতে হবে। তা কেবল উপনিষদসমূহ দ্বারা ঘটতে পারে। সেইজন্য উপনিষদসমূহ কেবল জীবনমুক্ত সত্তা বিকশিত করে তা নয়, উপনিষদসমূহ অবতার তৈরি করে। লোকেরা আমায় জিজ্ঞাসা করে, 'কেবলমাত্র ভারতবর্ষে এত অবতার কেন?' এই দেশের বিদ্যা, উপনিষদসমূহই কেবল অবতার নির্মাণ করতে সক্ষম, তাই ভারতে বহু অবতারগণ এসেছিলেন, আছেন ও আসতে থাকবেন! পৃথীগ্রহে যদি অবতারগণকে সম্ভব হতে হয়, তা একমাত্র ভারতেই সম্ভব, কারণ উপনিষদসমূহ সহকারে জীবন যাপন কেবল ভারতেই হয়। কেবল উপনিষদসমূহের জন্য এই দেশ হল সবচেয়ে পবিত্র দেশ। যতদিন উপনিষদসমূহ এই দেশের শ্বাসপ্রশ্বাস হয়ে আছে ও থাকবে, ভারতবর্ষে অবতার ঘটতেই থাকবে। ।। বেদ বেদান্ত সারঃ ।। বেদ বেদান্তের সুগন্ধসার হল উপনিষদসমূহ তোমাকে মহাজগতে নিয়ে যাবার জন্য এর সক্ষমতা, তোমাকে মহাজগতে উত্তোলন করার জন্য এর দক্ষতা, তোমাকে মহাজগতে বিকরণ করানোর জন্য এর নিপুণতা; তা প্রশংসিত, অকল্পনীয়। ॐ পরিচ্ছেদ ৭ বিজ্ঞান, ঐশ্বরিক চেতনার জন্য তোমার সত্তাকে বিশোধন কর সত্তার সত্য সূর্যচন্দ্র চক্র দ্বারা পরিবর্তিত হয় না। কিছু গ্রন্থ তোমার মধ্যে জ্ঞান ও ভক্তি জাগরিত করতে পারে; কিন্তু একমাত্র উপনিষদসমূহ তোমার সত্তায় জ্ঞান-ভক্তি-বিজ্ঞান তিনটি জাগ্রত করতে পারে। উপনিষদসমূহ সুবিশাল! এর পাঠ ও উপলব্ধি দ্বারা বিশোধিত হয় ঐশ্বরিক বুদ্ধি, ঐশ্বরিক ভাবানুভূতি ও তোমার অস্তিত্বের শুদ্ধতা। কিছু গ্রন্থ তোমার বুদ্ধিকে পরিশোধিত করে , কিছু গ্রন্থ তোমার ঐশ্বরিক ভাবাবেগ বিশোধিত করতে পারে, কিন্তু একমাত্র উপনিষদসমূহ তোমার বুদ্ধি, ভাবাবেগ ও তোমার বিশুদ্ধ অস্তিত্বকে (সতা, beingness) পরিশোধন করতে পারে। তোমার বিশুদ্ধ অস্তিত্ব অর্থ, মুক্তিকে ভবিষ্যৎ-বর্তমান-অতীতে তোমার বিদ্যমানতা হিসাবে অভিজ্ঞতা করা; মুক্তিকে তোমার ভবিষ্যৎ-বর্তমান-অতীত হিসাবে অভিজ্ঞতা করা। তোমার সত্তাকে শোধন করলে পুত বুদ্ধি তোমার সত্তার অংশ হয়ে যায় এবং তা তোমার সত্তায় চেতনা হয়ে থেকে যায়; এটা তো এক শক্তিশালী অস্তিত্ব-সম্বন্ধীয় ও অভিজ্ঞতামূলক সত্য। উদাহরণস্বরূপ, যদি তোমার ‘তুমি’ সম্পর্কে একটি দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে তুমি এক আশীর্বাদপুষ্ট সত্তা, ঈশ্বর তোমার সহায়তা করছেন ও তিনি অবিরাম তোমার যত্ন করছেন; তুমি তার কাছে প্রার্থনা করলে তিনি তোমার সহায়তা করেন - সেটা তোমার নিজের সম্পর্কে তোমার খুব সুন্দর সূক্ষ্ম ও পবিত্র অভিজ্ঞতাগুলির মধ্যে একটি। একইভাবে যদি তোমার সেই অনুভূতির সংযুক্তি থাকে, ‘যখনই আমি ঈশ্বর বা গুরুকে ডাকি, সাথে সাথে তিনি আমায় সাড়া দেন, তিনি আমার কাছে উপলব্ধ হন,’ যদি এটা তোমার অংশবিশেষ হয়, তাহলে এটা বিশ্বাস (faith or belief) নয়। এগুলি বিশ্বাস, ফেইথ বা বিলিফ, নয়। এগুলি আরও গভীর, তোমার অবহিত হওয়া চারপাশের তথাকথিত বাস্তবতার চেয়ে বাস্তব। যদি তুমি অনুভব কর - যেই মুহূর্তে তুমি তোমার ইষ্ট দেবতা বা গুরুকে ডাক, তিনি সাথে সাথে সাড়া দেন, তিনি তোমার সাথে থাকেন - সেটা সূক্ষ্মতম বিশুদ্ধ ভাবাবেগ। আবার 'পরিণামে আমি জানি আমি জীবনমুক্ত হব এবং মহাজগতে আনন্দে থাকব। জন্মমৃত্যুচক্রের দুঃখভোগের কোন প্রশ্নই ওঠে না' - কখনও কখনও এটাকে মানুষ তার মধ্যে খুব গভীরভাবে অনুভব করে। এটা বিশ্বাস বা ফেইথ নয়, তা স্বচ্ছভাবে বুঝে নাও। বিশ্বাস সূর্য-চন্দ্র চক্রের সাথে আসে আর যায়। যা কিছু সূর্য-চন্দ্র চক্রের সাথে উদিত হয় ও অস্ত যায়, তা বিশ্বাস। যদি পূর্ণিমাতে অনুভব কর সবকিছু ভাল চলছে, আর আমাবস্যায় দেখ, 'না। জানি না। এখন হচ্ছেটা কি?', তাহলে সেটা বিশ্বাস। সূর্য-চন্দ্রের চক্রের সাথে যা আসে আর যায় তা হল বিশ্বাস। কিন্তু কখন কখন আসা-যাওয়ার বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে কিছু উপলব্ধি তোমার জৈব-স্মৃতির (Bio-memory) অংশ হয়ে যায়; তা সেখানে সদাই সকল পরিস্থিতিতে থেকে যায়। কেবল সেগুলি সূক্ষ্ম, শুদ্ধ ভাবাবেগ, বুদ্ধি এবং সত্তার সত্য। ঐশ্বরিক ভাবাবেগ, সত্তার সত্য এবং পৃত বুদ্ধি, আসা-যাওয়ার সূর্য-চন্দ্র চক্রের ওপরে ভিত্তি করে পরিবর্তিত হয় না। যদি তোমার বুদ্ধিগত বোধ থাকে, 'আর যাই হোক এগুলি সব যেখান থেকে এসেছিল সেখানেই মিশে যাবে, ব্যাস'। যদি এই উপলব্ধি সূর্য-চন্দ্রের আসা-যাওয়া দ্বারা পরিবর্তিত না হয়, তাহলে তাকে বলে জ্ঞান। একইভাবে, 'আমার যতই আত্মসংশয়, আত্মঘৃণা, আত্মবর্জন থাকুক, যে উৎস থেকে আমি ঘটেছি তা আমাকে কখনও বর্জন করবে না। তিনিই তো উৎস। আজ বা আগামীকাল
সপ্তম পরিচ্ছেদ বিজ্ঞান, ঈশ্বরিক চেতনার জন্য তোমার সত্তাকে বিশোধন কর
আমাকে তাঁর সাথে মিশে যেতে হবে। তাঁকেই তো আমাকে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং আমাকে তাঁর মধ্যে মিলিয়ে যেতে হবে। তাই তিনিই তো পরম।’ - যদি এই উপলব্ধি, এই অনুভূতির সংযুক্তি তোমার মধ্যে ঘটে, যা সূর্য-চন্দ্র চক্রের আসা যাওয়া দ্বারা পরিবর্তিত হয় না, তাকেই বলে ভক্তি বা ঐশ্বরিক ভাবাবেগ। [আত্মসংশয় থেকে আত্মবৃণা ও পরে আত্মবর্জন হয়। ইংরাজীতে self-doubt, self-hatred, self-denial, স্বামীজী একে বলেন SDHD] আর যদি এরকম ধারণা হয় যে, ‘আমি এখন বন্ধন বা মুক্ত, যাই অনুভব করি না কেন, পরিণামে আমাকে কখনও বন্ধনে রাখা যায় না, কারণ আমি মহাজগতের প্রতিফলন। মহাজগৎ বা প্রতিফলন - কোনটাকেই বন্ধনে রাখা যায় না। সূর্যকে বন্ধনে রাখা যায় না, আবার জলে বা আয়নাতে তার প্রতিফলনকেও বেঁধে ফেলা যায় না। তুমি আয়নাটাকে বেঁধে ফেলতে পার বা জলকে পাত্রে আটকে রাখতে পার, কিন্তু প্রতিফলনকে নয়?’ এই উপলব্ধি যদি তোমার অন্তঃকরণে থাকে, যা সূর্য ও চন্দ্রের সাথে যাওয়া আসা করে না, উপরে নীচে হয় না, তাহলে সেটাকে বলে বিজ্ঞান, চৈতন্য, ঐশ্বরিক চেতনা, মহাজাগতিক চেতনা। কিছু গ্রন্থ তোমার মধ্যে জ্ঞান জাগরিত করতে পারে, কিছু গ্রন্থ তোমার মধ্যে ভক্তি জাগরিত করতে পারে; কিন্তু একমাত্র উপনিষদসমূহ জ্ঞান-ভক্তি-বিজ্ঞান তিনটিই তোমার মধ্যে জাগ্রত করতে পারে। উপনিষদসমূহ, কেবল উপনিষসমূহের তোমার মধ্যে এই তিনটিই জাগরিত করার সামর্থ্য আছে। এটা গঙ্গামাতা ও সরস্বতীমাতার উপহার। সরস্বতী ও গঙ্গা উপত্যকায় সেই সভ্যতা ঘটে; তাদের যুদ্ধ করার বা আত্মরক্ষা করার প্রয়োজন ছিল না, সেই সভ্যতার কোন শক্ত্রতা অথবা দখল করার প্রবণতা ছিল না, সেই সভ্যতা বহির্জগৎ ও বহির্জগতের সুখের জন্য বিব্রত ছিল না। আমাদের পূর্বপুরুষেরা বহির্জগৎ সম্পর্কে অবিদিত ছিলেন না, তারা বহির্জগৎ নিয়ে বিব্রত হন নি! সেই মহান সভ্যতায়, যেখানে সমস্ত প্রয়োজনীয়তা পূরণ ক'রে স্বাভাবিকভাবে বিরাট শান্তি প্রদান করা হয়েছিল, সেখানে উপনিষদসমূহ ঘটে। এটা বুঝে নাও, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পরম সম্পদ যা তুমি তোমার জীবনে সংগ্রহ করতে পার, তা হল জ্ঞান - ঐশ্বরিক অবগতি, ভক্তি - ঐশ্বরিক ভাবানুভূতি এবং বিজ্ঞান - ঐশ্বরিক চেতনা। বুঝে নাও, উপনিষদসমূহ অভিজ্ঞতা করার জন্য তোমার যে বোধের প্রয়োজন তা হল উন্মুক্ততা, আর কিছুই নয়। উপনিষদসমূহকে উন্মুক্ত হয়ে গ্রহণ কর, তবেই জ্ঞান-ভক্তি-বিজ্ঞান, তিনটিই তোমার নধ্যে ঘটবে। ॐ পরিচ্ছেদ ৮ অদ্বৈত জীবন, উপনিষদসমূহের সুগন্ধসার অদ্বৈত জীবন যাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় বুদ্ধি -সম্পর্কিত সমস্ত বোধ হল জ্ঞান। অদ্বৈত জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুভূতি -সংযুক্তির সমস্ত শক্তিগুলি হল ভক্তি। অদ্বৈত জীবন যাপনের জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় চেতনাগুলি হল বিজ্ঞান। ৪৫ অদ্বৈত জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত বৌদ্ধিক উপলব্ধি থাকা আবশ্যক। অদ্বৈত জীবন অর্থ সর্ব-শক্তি, সর্ব-জ্ঞান, সদা আনন্দ, সৎচিদানন্দ বিকিরণ করা। সৎচিদানন্দ বা সচ্চিদানন্দ (সৎ - সত্য, চিৎ - জ্ঞান, আনন্দ) হিন্দু মস্তিষ্কের এক অলীক কল্পনা নয়। এটা তারকবন বা নৈমিষারণ্যের আদি ঋষিদের কোন রূপকথা নয়। সৎচিদানন্দ এক বাস্তবতা! উপনিষদসমূহ। উপনিষদসমূহ অদ্বৈত জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিপূর্ণ প্রসারণ। উপনিষদসমূহ যেভাবে জ্ঞান ব্যাখ্যা করে, তা বোঝার জন্য আপনাকে অদ্বৈত জীবন যাপন করতে হবে! এইপ্রকার অতি উৎকৃষ্ট মস্তিষ্কে অলীক কল্পনা অথবা বিভ্রান্তি থাকতে পারে না। যাঁরা এই প্রকার উচ্চস্তরের সত্যসকলকে আয়ত্ব ক ’রে, উপলব্ধি ক’রে কাব্যের মাধ্যমে উপস্থাপিত করতে পারে, কোনভাবেই তুমি তাঁদের অলীক কল্পনা বা বিভ্রান্তি আছে বলে দোষারোপ করতে পার না। সেইজন্য সৎচিদানন্দ বিভ্রান্তি নয়। তা তোমার প্রাতঃ রাশ বা শুভরাত্রির নিদ্রার মতই সত্য। যদি তুমি আমাকে এসে বল যে তুমি প্রাতঃরাশ (ব্রেকফাস্ট) করেছ, আমি তোমাকে মায়া বা বিভ্রান্তিতে আছ বলে অভিযুক্ত করব না। আমি জানি তা এক বাস্তব। কারণ প্রাতঃরাশ সম্ভব, তুমি তা খেতে পার। এটা সহজ ব্যাপার! যদি বল, রাত্রে ভাল ও শান্তিপূর্ণ ঘুম হয়েছে, তখন আমি তোমাকে বিভ্রান্ত হয়ে আছ বলে দোষারোপ করব না। রাত্রে ভাল ঘুম তো এক সহজ সম্ভাবনা! সৎচিদানন্দ - সর্ব-জ্ঞান, সর্ব-শক্তি, সদা-আনন্দ, এমনই এক সহজ সম্ভাবনা। তোমার উচ্চতর সম্ভাবনার বিদ্যমানতাকে অস্বীকার করা খুবই হতাশাজনক। তোমার উচ্চতর সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা হল তোমার ভবিষ্যতকে বর্জন করা! যদি তুমি অস্বীকার কর যে তুমি কখনও ধনী, সুখী, সাচ্ছন্দ্যময় হতে পারবে, তুমি তাহলে তোমার সম্পূর্ণ ভবিষ্যতকে অস্বীকার করছ। একইভাবে তোমার সচ্চিদানন্দের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার অর্থ হল তোমার আধ্যাত্মিক ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করা। সেটা তো আধ্যাত্মিক আত্মহত্যা! কেউ যেন তোমাকে আধ্যাত্মিক আত্মহত্যা করার জন্য জোর না করে। আর অসংখ্য মানুষ আছে যারা তাদের সরাসরি ও পরোক্ষভাবে শিক্ষা ও প্রচার মারফৎ তোমাকে আধ্যাত্মিক আত্মহত্যা করার জন্য জোর করে যাচ্ছে। টিভি, সিনেমা, বই, নানা বিনোদনের শো, প্রচারমাধ্যম (মিডিয়া), ইন্টারনেটের মাধ্যমে লোকেরা অনবরত তোমার ভবিষ্যতের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার জন্য জোর করে চলেছে। শুরু হলেন এই সকল অজ্ঞতার জন্য মৃত্যুর ঘন্টা। শুরু হলেন তোমার আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার জন্য এক শক্তিশালী জেগে ওঠার ডাক। তোমাকে তোমার আধ্যাত্মিক ভবিষ্যতের নিমিত্ত জাগ্রত করা, তোমাকে তোমার আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাতে জাগ্রত করা - তা হল গুরু বা মাস্টারের কাজ! সচ্চিদানন্দ (সৎ, চিৎ, আনন্দ) বিভ্রম, মায়া বা অলীক কল্পনা নয়। সচ্চিদানন্দ সম্ভব, সচ্চিদানন্দে জীবন যাপন করা সম্ভব। অদ্বৈত জীবন সম্পর্কে এটাই আমি প্রথম বিবৃতি হিসাবে দিতে চাই দ্বিতীয় : সেই আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার জন্য যে বোধসমূহ তোমার চাই, তা হল জ্ঞান। তারপর যখন তুমি অদ্বৈত জীবন যাপন শুরু কর, রূপান্তরণের মধ্য দিয়ে যাবার সময় নির্দেশিত কিছু আবেগে-বল তোমার দরকার। ভক্তি, ভাব ও আবেগের প্রবলতাকে অদ্বৈত জীবনে প্রবলভাবে প্রবেশ করার জন্য ব্যবহার করা যায় এবং তবে তুমি উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তরে যেতে পার। বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে এসে মানুষের সন্ন্যাস গ্রহণ করা ঠিক নয়; যারা এরকম করেছে তাদের সন্ন্যাসজীবন কখনও সার্থক হয় নি। তোমার ভাবাবেগ এক বিশুদ্ধ শক্তি যা তোমাকে এক আকাশ থেকে অন্য আকাশে প্রেরিত করতে পারে। যারা সেই ক্ষমতা, সেই শক্তি ব্যবহার ক’রে সন্ন্যাস গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়, একমাত্র তারাই সফল সন্ন্যাসী হয়। বুদ্ধি দিয়ে যারা বিশ্লেষণ করেছিল, তারা কখনও নয়। যদি তুমি অদ্বৈত জীবন যাপন করার জন্য প্রস্তুত হতে পার, সেটা তোমার বিশুদ্ধ ভক্তির ক্ষমতা! সেটা কেবলমাত্র তখনই হবে যখন তুমি তোমার ভাবাবেগের ও ভক্তির শক্তিকে ব্যবহার কর। সেটাই তো জীবন। বুঝে নাও, অদ্বৈতজীবন অভিজ্ঞতা করা নিমিত্ত প্রয়োজনীয় ঐশ্বরিক ভাবাবেগ হল ভক্তি। আর প্রয়োজনীয় ঐশ্বরিক চেতনা অর্থাৎ অদ্বৈতজীবন অভিজ্ঞতা করা নিমিত্ত কোন সংশয় বিনা মৌলিক বোধগুলি হল বিজ্ঞান। আধ্যাত্মিক পুস্তক পাঠ অথবা সৎসঙ্গ শ্রবণ হল আধ্যাত্মিক চেতনা বিকশিত হবার জন্য অনুমতি প্রদান করা। যদি তুমি মাস্টারের মুখনিঃসৃত দশটি কথা শোন, তুমি হয়ত দুটি ধারণা নিয়ে তর্ক করবে, কিন্তু হঠাৎ চার পাঁচটা ধারণা অন্তরে প্রবেশ ক’রে তোমার চেতনাতে মিশে যাবে এবং তোমার অটল বোধশক্তি হয়ে যাবে! এমনকি তখন তুমি সেগুলি সম্বন্ধে প্রশ্ন করাও ভুলে যাবে। তোমার আধ্যাত্মিক চেতনাকে প্রতিদিন উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাওয়া, এবং তাকে তোমার আত্মসংশয়, আত্মঘৃণা ও আত্মবর্জনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া হল সৎসঙ্গের উদ্দেশ্য। উপনিষদসমূহের প্রধান সারগর্ভসার হল তোমাকে জ্ঞান, ভক্তি ও বিজ্ঞান প্রদান করে অদ্বৈতজীবন যাপনে সহায়তা করা। সত্যসকল, ঐশ্বরিক ভাবাবেগ, ঐশ্বরিক চেতনা - এই উপলব্ধিগুলিকে তোমার সত্তায় নিয়ে আসা হল অদ্বৈতজীবন।
অষ্টম পরিচ্ছেদ অদ্বৈত জীবন, উপনিষদসমূহের সুগন্ধসার
পরিচ্ছেদ ৯ উপনিষদসমূহ তোমার মহাদেব-উপাদানকে স্মরণ করায় মহাদেব-উপাদান, যা তোমার ইচ্ছা পূরণ করে, যা আপনাকে নিজের সম্বন্ধে খুবই সুন্দর অনুভূতি প্রদান করে , তা হল প্রকৃত তুমি। তা কেউ ছিন্ন করতে, দগ্ধ করতে বা তোমার থেকে সরিয়ে ফেলতে পারে না! উপনিষদসমূহে অতিরিক্ত কিছুই বলা হয় নি। এতে কোন সম্পাদনা (এডিটিং) বা ভাষ্য ও টীকা সম্ভব নয়। তা এত সুব্যক্ত ও যথার্থ! তাতে অতিরিক্ত কিছু যোগ করা যায় না। হয়ত তাতে কোনকিছু হাইলাইট ক'রে বারবার পুনরাবৃত্তি করতে পারা যায়। জীবনে শ্রেষ্ঠ হবার জন্য, তোমার সর্বোচ্চ সম্ভাবনাতে পৌঁছানোর জন্য যে ঐশ্বরিক জ্ঞান, ঈশ্বর বোধ প্রয়োজন, তা উপনিষদসমূহে সম্পূর্ণরূপে আছে। পাশে কোন লোককে বসে থাকতে দেখলে তুমি কেমন অনুভব কর; পাশে বসা একটি কুকুর দেখে তুমি কি অনুভব কর; সামনে একটি গাছ দেখলে তুমি কি অনুভব কর; তোমার সেই অনুভূতির ওপরে ভিত্তি করেই তারা তোমাকে সাড়া দেবে। যদি তুমি পাশে বসা মানুষটিকে জীবন্ত মনে কর, তুমি সাড়া দেবে প্রেম বা উপেক্ষা সহকারে অথবা অন্য কোন ভাবে। পাশে বসা কুকুরটিকে তুমি অন্য কোনভাবে সাড়া দেবে। কিন্তু যদি তুমি একইভাবে গাছকে সাড়া না দাও, তার অর্থ তুমি অনুভব কর না যে গাছেরা জীবন্ত। এই যুক্তিটিকে শ্রবণ কর; তুমি সিদ্ধান্তটি বুঝতে পারবে। আমরা কেন ভাবি যে উন্নিদ অত্তা জীবন্ত নয়, মানুষটি আরও বেশী জীবন্ত, কুকুরটি একটু কম জীবন্ত? কেন? কারণ, আমাদের একটি ভুল অর্গতি আছে - কার্য জীবন নির্ণয় করে। অস্তিত্ব জীবন নির্ণয় করে, কার্য নয়। ৫২ যেহেতু মানুষ কুকুরের চেয়ে বেশী কার্য করতে পারে, কুকুর গাছের চেয়ে বেশী কার্য করতে পারে, তুমি কার্যের ভিত্তিতে জীবনের অস্তিত্বকে মাপ। এটাই মৌলিক ভুল। এই প্রকার মৌলিক ভুলগুলি একমাত্র উপনিষদসমূহ দ্বারা মেরামত করা যায়, কেবল উপনিষদসমূহ! কারণ, কেবল উপনিষদের ধ্বনিদের সেই প্রকার অন্তর-আকাশ আছে। তোমার পাশে বসা কুকুরকে দেখে তুমি যদি বিচার কর যে তার খুবই নিম্ন জীবন, তাহলে তুমি হয়ত সাড়াই দেবে না এবং সেই কুকুরটিও সাড়া দেবে না। যদি কুকুরটির অস্তিত্বকে স্বীকার কর, সে নিজেকে ভালবাসবে ও তোমাকেও ভালবাসবে। যে তোমায় নিজেকে ভালবাসতে শেখায়, তুমি তাকে প্রেম কর। এটাই জীবনের নিয়ম। তোমার মনোভাব ভিন্ন হতে পারে : শ্রদ্ধাশীল, কখন সন্ত্রম, কখন ভয়; কিন্তু যে তোমাকে তোমার নিজের সাথে প্রেম করায়, তুমি তাকে প্রেম করবে। আমার সমস্ত কাজ হল মানুষকে নিজের সাথে প্রকৃত প্রেম করানো। আমি অবিরত জীবন হিসেবে তোমার অস্তিত্বকে সম্মান করছি। যেভাবে আমি তোমার অস্তিত্বকে সাড়া দিই, একইভাবে আমি গাছপালার অস্তিত্বে সাড়া দিই। গাছপালার নিজের স্বার্থে শোষণ করার প্রবৃত্তি নেই এবং যা কিছু তারা নেয়, তা তারা তাদের অংশ হিসাবে পেতে চায় না। কিন্তু মানুষ যা তাদের অংশ নয় তাকে নিজের অংশ হিসাবে আত্মভূত করে। তাই যে মুহূর্তে আমি সেই অংশকে আলা দ করি এবং দেখাই - তুমি কি - তুমি আমার সাথে প্রেম করে ফেলবে! মহাদেব-উপাদান, যা তোমার ইচ্ছা পূরণ করে, যা তোমাকে নিজের সম্বন্ধে খুবই সুন্দর অনুভূতি প্রদান করে, তা হল প্রকৃত তুমি। তোমাদের সবার মধ্যে মহাদেব-উপাদান আছে, যা তোমায় নিজের সম্বন্ধে এত সুন্দর অনুভূতি প্রদান করে। কখন কখন লোকেরা বলে যে সেই উপাদান তারা কখনও দেখে নি বা তাদের মধ্যে নেই অথবা তারা এখানে আসার পরে কেউ তা চুরি করেছে। শ্রবণ কর। কেউ তা কেটে ফেলতে পারে না, তাকে কেউ দগ্ধ করতে পারে না বা তোমার থেকে নিয়ে নিতে পারে না! আমাদের সবার মধ্যে মহাদেব-উপাদান আছে। তুমি যতই অস্বীকার কর না কেন, তুমি তার ঝলক নিশ্চয়ই পাও, তুমি তা অভিজ্ঞতা করেছই করেছ। যেই মুহূর্তে আমি তোমাকে জীবনমুক্ত সত্তা, শিব-গণ, মহাদেবের প্রতিমূর্তি হিসাবে সম্মান করি, তুমিও নিজেকে শ্রদ্ধা করা শুরু কর। যখন তুমি জানতে পার তোমার মধ্যে মহাদেব-উপাদান এখনও সক্রিয়, জীবন্ত ও তার মেয়াদ শেষ হয় নি, তখন তুমি তোমার সাথে প্রেমে পড়! নিজের সাথে প্রেমে পড়া হল নিত্যোৎসাহ (নিত্য উৎসাহ) বা চিরন্তন উদ্দীপনার একমাত্র উপায়। আর কিছু তোমাকে চিরন্তন উদ্দীপনা দিতে পারে না। তোমার মহাদেব-উপাদানের সাথে প্রেমে পড়, সেই উপাদান তো চিরন্তন উদ্দীপনা, অনুপ্রেরণা, নিত্যোৎসাহ। যে ব্যক্তি তার নিজের ভিতরে চিরন্তন উৎসাহকে স্পর্শ করেছে, একমাত্র তারই যুক্তির ঊর্ধ্বে সহিষ্ণু হয়ে থাকে। তোমার মধ্যে অযৌক্তিক সহিষ্ণুতা ও যুক্তির ঊর্ধ্বে সহিষ্ণুতা তখনই ঘটবে যখন তুমি তোমার মহাদেব-উপাদান, ঈশ্বরের অংশকে উপলব্ধি কর; কারণ তুমি তো তখন অস্তিত্বের সাথে প্রেমে আছ। তুমি তো সেই অস্তিত্বের সাথে সমাধিতে আছ। তোমার সেই মহাদেব-উপাদানের সাথে প্রেমে থাকা হল ভক্তি। যখনই তুমি শুষ্ক অনুভব কর, সেই উপাদানটিকে আবার আঁকড়ে ধর। তা তোমার মধ্যে অসাধারণ সহিষ্ণুতা নিয়ে আসবে যা সমস্ত যুক্তির ঊর্ধ্বে। যে যুক্তির ঊর্ধ্বের সহিষ্ণুতা অর্জন করছে, সে কখনও বিরক্ত হয় না অথবা বিনষ্ট হয় না। এটা জীবনের নিয়ম। যখন তুমি তোমার মহাদেব -উপাদান জান, তুমি তো অস্তিত্বের সাথে প্রেম আছ। তুমি তো তোমার সম্ভাবনাগুলির সাথে প্রেমে আছ। এটা কোন বিভ্রম বা মায়া নয়। এটা তোমাদের সকলের সম্ভাবনা। কেউ তোমার চেতনাকে সরিয়ে ফেলতে পারে না, কেউ তোমার জীবনমুক্তিকে হরণ করতে পারে না। কেউ তোমার উপলব্ধিকে সরিয়ে ফেলতে পারে না - তুমি তো মহাদেব। পরিশ্রান্ত ও বিষণ্ণ হই স্বরণে রাখ, ‘আমি মহাদেব আমার মহাদেব আমাই মালিক। মহাদেবের অভিজ্ঞতায় পৌছানোর জন্য তিনি আমাকে সবদাই স্বরণ করিয়ে দিচ্ছেন ও সহায়তা করছেন।’ এটা বুঝে নাও, চিন্তা করার ও কার্য করার অক্ষমতা কখনও তোমার মহাদেব-অস্তিত্বকে হরণ করে না। তোমার কার্য তোমার মহাদেবত্বকে, তোমার শিবত্বকে, তোমার মহাদেব-উপাদানকে স্পর্শ করে না। কেউ তা বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রকাশ করে, কেউ তা দেহ থেকে প্রকাশ করে। কিন্তু কেউ তা প্রকাশ করে অক্রিয় থেকে জটিলতা সৃষ্টি ক’রে - এটা তোমার বিশ্বাস করা এক বিরাট মিথ্যা! বুঝে নাও, অক্রিয় থাকা তোমার শিবত্বকে কেড়ে নেয় না। উদাহরণস্বরূপ, যদি কিছু না কর, তোমার শিবত্ব চলে যাবে ভেবে উদ্বিগ্ন হবে না। কিন্তু অক্রিয়তা তোমার শিবত্বকে অভিজ্ঞতা করতে দেবে না, শিবত্বকে প্রসারিত ও বিকিরণ করতে দেবে না। যদি তুমি অক্রিয় হও , তুমি তাহলে জটিল করছ। যখন আমি বলি, তোমার কাছে মহাদেবের উপাদান আছে, তার অর্থ তোমার অস্তিত্বের সর্বজ্ঞান, সর্বশক্তি, সদানন্দের সর্বাচ্চ সম্ভাবনা আছে, কারণ সেটাই তো প্রকৃত তুমি। সেই উপাদান নিয়ে জীবনযাপন শুরু কর, সেই উপাদানকে প্রেম করা শুরু কর। এই উপাদানকে তোমার পেশাতে, তোমার কেরিয়ারে, তোমার পরিবারে, তোমার সম্বন্ধতায়, তোমার জীবনে প্রকাশ করা শুরু কর। স্থির কর, কিভাবে মহাদেব প্রতিটি পরিস্থিতিতে সাড়া দেবেন। ‘যদি মহাদেব এই পরিস্থিতিতে হন, তিনি কিভাবে সাড়া দেবেন? আমিও সেইভাবে জীবন যাপন করি!’ সেটাই ধর্ম - তোমার সমস্ত সম্ভাবনা সহকারে আনন্দে থাকা। যদি সেই মহাদেব-উপাদান তোমার মধ্যে না থাকে, তুমি শ্বাস পর্যন্ত নিতে পারবে না! তোমার কল্পনায়, অকল্পনায় প্রজেক্টগুলো সমাপন করতে যত কিছু করতে হয়, তার দশ হাজার ভাগের একভাগও তোমাকে শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য করতে হয় না। শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য তোমার যত সচেতনতা ও অস্তিত্ব আবশ্যক হয়, কেবল তার দশ হাজার ভাগের একভাগ প্রচেষ্টা ও সচেতনতা প্রয়োজন তোমার জীবনের সমস্ত তথাকথিত প্রজেক্টগুলিকে সমাপন করার জন্য। তোমার জীবন আরও অনেক সহজ হয়, যদি তুমি অস্তিত্বমান হও। সবকিছু সম্ভব! সমস্ত সম্ভাবনাগুলিকে বাস্তবায়িত করার জন্য তোমাকে কোন আলাদা পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার প্রয়োজন নেই। তোমার পক্ষে সম্ভব নয় বলে যা কিছু তুমি বিশ্বাস করছিলে, তোমাকে কেবল সেইসব ভুল বিশ্বাসগুলিকে নাকচ করতে হবে। যা কিছু তোমার পক্ষে সম্ভব নয় বলে তুমি ইতিমধ্যে বিশ্বাস করা আরম্ভ করেছ - তা ঠিক আছে। কিন্তু অনেক জিনিষের জন্য, তুমি কোন মীমাংসা কর নি অথবা বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত কর নি যে সেগুলি তোমার পক্ষে সম্ভব নয় - সেইগুলি তোমার পক্ষে সম্ভব! কেবল সেগুলিকে স্মরণ করলে সেগুলি তোমার মধ্যে খুলতে শুরু করবে। তুমি যদি সম্ভাবনা খুলতে শুরু কর, সেগুলি হঠাৎ তোমার জন্য উপলব্ধ হয়ে যাবে। অনেক কিছুর জন্য তুমি দরজা বন্ধ কর নি, সেগুলি তো তোমার কাছে এখনও উপলব্ধ ও খোলা। তোমাকে তোমার সমস্ত সম্ভাবনা সম্পর্কে স্মরণ করানো হল ঐশ্বত জীবন এবং তা একমাত্র উপনিষদসমূহ দ্বারা সম্ভব।
নবম পরিচ্ছেদ উপনিষদসমূহ তোমার মহাদেব-উপদানকে স্মরণ করায়
পরিচ্ছেদ ১০ মহাজগতের মত জীবনযাপন করার জন্য মহাজাগতিক চেতনা উপনিষদসমূহ হল প্রথম, অগ্রণী ও অন্তিম কথা, বৃক্ষকে বৃক্ষাণ্ডের দেওয়া, মানবজাতিকে মহাজগতের দেওয়া। প্রতিটি উপনিষদ মন্ত্র হল মহাজগতের মত বাস করার জন্য মহাজাগতিক চেতনা 59 উপনিষদসমূহ বিজ্ঞানের মত প্রতিদিন বিকশিত হচ্ছে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আজ এক বিজ্ঞানী কোন কিছুকে সত্য বলে ঘোষণা করল এবং সবাই তা সত্য বলে মনে নিল। সেই সত্যকে ভিত্তি করে মানুষেরা তাদের জীবনের নির্নয়গুলি নিল ও জীবনকে সেইভাবে সারিবদ্ধ করল। তারপর লোকেরা জীবনকে সেইভাবে সারিবদ্ধ করবে। তার পাঁচ বছর পরে, অন্য কেউ আসবে ও সেটাকে ভুল বলে ঘোষণা করবে এবং অন্য কিছুকে সত্য বলে প্রমাণ করবে। এটা বুঝে নাও, সত্য যদি আগামীকাল পরিবর্তিত হতে থাকে, তা আজকেও সত্য নয়। উপনিষদ বিজ্ঞানের মত নয়, বিজ্ঞান তো বিকশিত ও পরিবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞানী যেন এক বিজ্ঞানী ঘন জঙ্গলের অন্ধকারে একটা লঠন নিয়ে গেছে, আর জঙ্গল সম্পর্কে সত্য বলছে, 'এখানে দশটি গাছ আছে, দুটি সাপ আছে এবং অন্ধকার...'। যখন সে জঙ্গলে আরেকটু ঢোকে, সে বলে, 'না! জঙ্গলে কেবল দশটি গাছ ও দুটি সাপ নয়; এখানে পঁচিশের বেশী গাছ এবং দুটি হাতিও আছে।' জঙ্গলের আরও গভীরে গিয়ে সে বলে, 'না! কেবল পঁচিশটা গাছ নয়। যেদিকেই আমি লঠন ধরি, চারিদিকে গাছ আর গাছ আর গাছ এবং বিভিন্ন প্রকার পশু!' এটাই হল বিজ্ঞান। কিন্তু উপনিষদসমূহ হল, ঋষিগণ উপবেশন ক'রে বজ্রের এক ঝলকে সম্পূর্ণ জঙ্গল দেখে তার বর্ণনা করেন। এই দুটির মধ্যে পার্থক্য বোঝ। লঠন দ্বারা দেখা বর্ণনা তো সর্বদাই পরিবর্তিত হতে থাকবে। কিন্তু ঋষিরা পাহাড়ের চুড়ায় বসে সমস্ত জঙ্গলকে বিস্তৃতির এক ঝলক দ্বারা দেখে নিয়ে তা লিখে রাখা হল উপনিষদসমূহ! সত্য সকল ঘোষণা করার জন্য উপনিষদসমূহের মত এত হৃদয়স্পর্শী আর কিছুই নেই ; জীবনযাপনের অতি সুন্দর উপায় ও সহজে ব্যবহারযোগ্য ! তোমার সম্পূর্ণ চেতনাকে শুদ্ধ কর ও তাকে প্রস্তুত রাখ! ভগবৎ গীতাকে উপনিষদের মত বলা হয়েছে, উপনিষদ নয়! হিন্দু প্রথাতে এমনকি অবতারগণের বাণীও উপনিষদের স্তরে রাখা হয় নি। শ্রুতি, যা শ্রবণ করা হয়েছে! উপনিষদ কোন ঋষি বলেন নি, তা ঋষিগণ শ্রবণ করেছেন। উপনিষদ হল সরাসরি মহাজগতের নিজের সম্বন্ধে মহাজগত্কে মহাজাগতিকভাবে ঘোষণা করা। তাই হল মহাজগতের নিজের সম্পর্কে গীত গাওয়া! জীবন সম্বন্ধে তোমার সমস্ত পুরাতন ধারণাগুলিকে মুছে ফেল। ঈশ্বর সম্পর্কে তোমার পুরাতন ধারণা মুছে ফেল। নিজের সম্পর্কে , বিশ্ব সম্পর্কে তোমার সমস্ত বোধগুলিকে ফেলে দাও। তোমার পুরাতন ধারণাগুলিকে ফেলে দাও এবং ঝরঝরে তাজা হয়ে ওঠ সরাসরি মহাজগৎ থেকে আদি মহাজাগতিক চেতনা গ্রহণ করার জন্য , মহাজগৎ যেভাবে চায় সেভাবে তোমার জীবনযাপন করার জন্য। উপনিষদসমূহ এতই সরস ও মসলাদার ! এগুলি শুষ্ক পুস্তক নয়। এগুলি অসাধারণ উপলব্ধি প্রদান করে ! এগুলি রসে ভরা; এগুলির সৌন্দর্য অনেক; এগুলিতে প্রচুর আনন্দ! এগুলি এতই সজীবতায় ভরা। উপনিষদের প্রতিটি মন্ত্র তোমার জন্য মহাজগৎ হয়ে জীবনযাপন করার জন্য এক মহাজাগতিক চেতনা। তোমার নিজের সাথে সম্পর্কতা, তোমার ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কতা, জীবনের সাথে তোমার সম্পর্কতা, জীবনের সাথে তোমার সম্পর্কতা, সবকিছুর সাথে তোমার সম্পর্কতা উপনিষদের মন্ত্রগুলি দ্বারা নিরূপণ ও পুনর্নির্ধারণ করা যায়। উপনিষদের মন্ত্রসমূহ কতই না নিগূঢ়! উপনিষদের মন্ত্রগুলি পৃথীগ্রহে শোনা যে কোন শব্দের চাইতে অনেক বেশী শক্তিশালী। এমন শক্তিশালী স্পন্দনে এই শক্তিশালী সত্যসকল তুমি গ্রহণ করতে যাচ্ছ। নিজেকে তৈরি কর, নিজের সম্পর্কে তোমার পুরানো ধারণা মুছে ফেল, সেগুলির সাথে পূর্ণত্ব কর, কারণ তুমি পূর্ণের সাথে পূর্ণত্ব করতে যাচ্ছ এবং সম্পূর্ণ পূর্ণতার আকাশে প্রবেশ করতে যাচ্ছ, যাকে উপনিষদসমূহ বর্ণনা করে মহাজগতের অবস্থা হিসাবে, ব্রহ্মাত্মের অবস্থা হিসাবে। মহাজাগতিক উপলব্ধির জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও, কারণ উপনিষদসমূহের প্রতিটি শ্লোক হল জীবনসম্মতিসূচক। উদাহরণস্বরূপ, একটি উপনিষদের দ্বিতীয় শ্লোক বলে, ‘এইপ্রকার মুক্তজীবনে শত বৎসর বাঁচার নির্ণয় নাও।’ কি দারুণ জীবনসম্মতিসূচক বিজ্ঞান! এতে নেতিবাচক বা নাকারাত্মক জীবনের কোন আভাসই নেই। আর প্রত্যেকে যারা এই মন্ত্রগুলি শোনে, তাদের ডি এন এ (DNA) শতায়ু হওয়ার নির্ণয় নেবে, নির্ণয় গ্রহণ করার সহায়তা পাবে ও সেইভাবে প্রোগ্রামিং করা হবে। কেবলমাত্র এই মহাজাগতিক চেতনাগুলি প্রদান করাই নয়, সেগুলি তোমার অন্তঃসার হওয়ার নির্ণয় নেবে। বা ডি এন এ হয়ে যায়, তোমার জৈবস্মৃতি ও পেশীস্মৃতি তৈরি হয়! তোমার জৈবস্মৃতিকে উপনিষদসমূহে প্রোগ্রামিং করা হয়; তোমার ডি এন এ, তোমার পেশীস্মৃতি ও জৈবস্মৃতিকে উপনিষদসমূহে পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাস করা হয়। প্রতিটি মন্ত্রকে শ্রবণ করা উচিত, ভালবাসা উচিত, আত্মস্থত করে বিকিরণ করে ও সমৃদ্ধকরণ করে জীবনযাপন করা উচিত ! এই নতুন চেতনা সহকারে জীবনযাপন করার জন্য পুরাতন ধারণাগুলিকে মুছে ফেলে প্রস্তুত হও। পুরাতন ধারণাগুলিকে মুছে ফেলে, উপনিষদসমূহকে তোমার অস্তঃসারে, তোমার ডি এন এ-তে রেকর্ড করা হল মহাজাগতিক চেতনা। সম্পূর্ণ হিন্দুধর্মে বৈদিক প্রথার জন্য প্রস্থাবলী হল উপনিষদসমূহ। এখানে ঋষিপণ বিশ্বব্রক্ষাণ্ডকে প্রধান সারবানী প্রদান করেছেন। ধর্ম, বিশ্বে মহাজাগতিক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া - এটাই সবচেয়ে বড় সেবা যা মানুষ পৃথিবীতে করতে পারে। একবার এই উপনিষদসমূহ সম্বন্ধে বলা হয়ে গেলে এই গ্রন্থ সমস্ত বৈদিক প্রথার সারগ্রন্থ হয়ে যাবে! খুবই বিনয় সহকারে, মহাজগতে মহত্তম আধ্যাত্মিক ঘটনাগুলির মধ্যে একটি এখন ঘটছে এই উপনিষদসমূহের প্রকাশে, উপনিষদসমূহের আকাশলেখন পাঠে। আমি টীকা বা মন্তব্য করতে যাচ্ছি না; আমি কেবল ব্যাখ্যা করতে যাচ্ছি উপনিষদের ধ্বনিরা যে প্রসঙ্গ (context) থেকে প্রকাশ করেছিলেন, শ্লোকের আগে ও পরে। আমি তার পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছি। উপনিষদসমূহ উপভোগ করার জন্য, অভিজ্ঞতা করার জন্য, বিকিকরণ করার জন্য প্রস্তুত হও। তোমারা সকলে শিবগণ হয়ে সরাসরি মহাদেবের আকাশ থেকে উপনিষদসমূহ গ্রহণ কর এবং তাকে জীবনে ধারণ কর, তা নিয়ে জীবনযাপন কর! তোমার সমস্ত পুরাতন ধারণাগুলির সাথে পূর্ণত্ব কর। মহাজাগতিক চৈতন্যকে নিজ চেতনা হিসাবে পাবার জন্য প্রস্তুত হও। উপনিষদের ঋষিগণ সমগ্র বিশ্বকে যা প্রদান করেছিলেন তা যেন আমরা গ্রহণ করতে পারি, সেইজন্য তাঁরা যেন আমাদের মধ্য দিয়ে বিকিরণ করেন ও আমাদের আশীর্বাদ করেন। আদি ঋষি, আদি গুরু মহাদেব, যিনি উপনিষদসমূহ সপ্ত ঋষি এবং সনত, সনতকুমার, সনাতন, সনকাদি এই চার শাশ্বত ঋষিদের মধ্যে সঞ্চারিত করেন, তাঁর কাছে আমরা প্রার্থনা করি এই মহান সত্যসকল প্রকাশ করার জন্য এবং যাতে পূর্ণ হয় আমাদের সকলের জীবন ও অভিজ্ঞতা করি শিবোহম্।
দশম পরিচ্ছেদ মহাজগতের মত জীবনযাপন করার জন্য মহাজাগতিক চেতনা
টীকাপুঞ্জ অদ্বৈত : দুই নয় এমন; বিশ্বব্রক্ষাণ্ডের সাথে একত্ব ও অসীমত্ব অভিজ্ঞতা করার এমন এক আকাশ যেখানে প্রত্যেকে অসীম শক্তিময় ও অমিত বুদ্ধিমত্তাশীল; সেই আকাশে সবই ‘তুমি’ এবং ‘তুমি’ই সব। অদ্বৈতী : যে অদ্বৈত অবস্থায় আছে। অনুভূতির সংযুক্তি : Feeling connection আস্তিত্ব : বাস্তবতা, সত্তা, being, existence আকাশ : space, স্থান, জায়গা। এখানে ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন, অন্তর-আকাশ আকাশ-লেখন : আকাশিক রেকর্ড। আকাশে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সমস্ত ঘটনাবলীর মহাজাগতিক রেকর্ড। একমাত্র এক অবতার যিনি স্থান-কালের ঊর্ধ্বে, তিনি সরাসরি মহাজপতের সংরক্ষণাগার (আর্কাইভ) থেকে এই সত্য-লেখন পাঠ করে তার রহস্যোদ্ধার করে প্রকাশ করতে পারেন। আত্মসংশয়, আত্মঘৃণা ও আত্মবরর্জন : self-doubt, self-hatred and self-denial; আত্মসংশয় থেকে আত্মঘৃণা এবং পরে আত্মঘৃণা থেকে আত্মবরজন হয়। আদি শংকর : অষ্টম শতাব্দীর জীবনমুক্ত অবতার ও মাস্টার শংকরাচার্য; তিনি অদ্বৈত বেদান্তের ব্যাখ্যাকারী ও সনাতন ধর্মের পুনরুদ্ধারকারী। ৬৬ আবেগ-বল : emotional strength আর্কইভ : (ইংরাজীতে Archive), সংরক্ষণাগার, মহাফেজখানা। উপনিষদ: পবিত্র মহাজাগতীয় প্রকাশ সমূহ যা পৃথীীগ্রহে সমস্ত আধ্যাত্মিক গ্রন্থ বা বেদসকলের উৎস। আক্ষরিক অর্থে উপনিষদ হল ‘মাস্টারের সাথে বসা’। বেদের ১১৮০টি শাখার সাথে সম্পর্কিত ১১৮০টি উপনিষদ ছিল; তাতে ১০৮টি হল মুখ্য উপনিষদ। কুণ্ডলিনী : প্রতিটি মানুষের মূলাধার চক্রে স্থিত সম্ভাবনাত্মক শক্তি। গুরু : মাস্টার, যিনি গু (অন্ধকার) থেকে রু-তে (আলোক) পরিচালনা করেন; যিনি জন্মমৃত্যুচক্র থেকে মুক্ত করেন। চার্বাক : আক্ষরিক অর্থ হল স্বকীয় কথন। বৌদ্ধিক প্রথার ‘নাস্তিকা’ গোত্র জোর দেয় দ্বানিয়ার দিকে নির্দেশিত বস্তুবাদ, দাশনিক সংশয়বাদ এবং নাস্তিক্যবাদী তত্ত্বের দিকে। চৈতন্য মহাপ্রভু: বাংলার পঞ্চদশ শতাব্দীর জীবনমুক্ত মাস্টার ও অবতার। তিনি ভারতবরকে কৃষ্ণভক্তি র রসে প্লাবিত করেন। চ্যানেল : ইংরাজীতে channel, পথ। জীবনমুক্তি : সোজা কথায় মুক্তি। মুক্ত জীবন লাভ করা, পরমালোক বা পরমজ্ঞান প্রাপ্তি, বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি, enlightenment, liberation জৈবস্মৃতি : Bio-memory জ্ঞানসম্বন্ধর : সপ্তম শতাব্দীতে তিরুজ্ঞানসম্বন্ধর ছিলেন এক তামিল বালক ও অবতার। তিনি শৈব-সিদ্ধান্তকে পুনর্জাগরিত করেন। ডি এন এ : DNA বা ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড একটি লম্বা অণু যা কোষের ভিতরে জীবের বিশেষ জেনেটিক কোড বহন করে। তারক বন : ঋষিগণ অধ্যুষিত অরণ্যের ভিতরে সবচেয়ে পুরাতন আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়। ত্যাগরাজা : ত্যাগের রাজা, শিবকে ত্যাগরাজা বলা হয়। দক্ষিণামূর্তি : দক্ষিণদিকে মুখ করা নিরাকার বিগ্রহ। আদি গুরু মহাদেব শিবের এই স্বতন্ত্র শক্তি স্পন্দনময় নীরবতায় মুক্তি প্রদান করেন। নকারাত্মক : নেতিবাচক, negative নৈমিষারণ্য : গোমতী নদীর তীরে পুরাণ ও মহাভারতে উল্লেখিত প্রাচীন বন। বহু ঋষির প্রকাশ ও কথন এখানে ঘটে, ঋষমন, মহাভারত। পতঞ্জলি : যোগের পিতা ও প্রতিষ্ঠাতা। তিনি যোগশাস্ত্র ‘পতঞ্জলি যোগসূত্র’-এর জন্য সুবিদিত। পরিচিতি : Identity, পরিচয় সম্পর্কিত পুরাণ : পুরাণকে mythology (মাইথলজি) বলে ভুল করা হয়। পুরাণে আছে মহান ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, ঐশ্বরিক লীলার বর্ণনা। পূর্ণত্ব : Completion (কমপ্লিশন)। পূর্ণত্বের আকাশ বা অবস্থা যা এই সত্যকে সূচিত করে যে পূর্ণ থেকেই পূর্ণের উদয় হয়; পরমহংস নিত্যানন্দ এই ‘পূর্ণত্বের বিজ্ঞান’ প্রকাশিত করেছেন। স্বামিজী ‘পূর্ণ’ বোঝাতে ইংরাজীতে complete (কমপ্লিট) শব্দটি প্রয়োগ করেছেন। প্রসঙ্গ : context, উপলক্ষ্য, অনুষঙ্গ, পূর্বাপর সম্বন্ধ। বিজ্ঞান ভৈরব তন্ত্র : ভগবান শিব তার সঙ্গী দেবী অথবা শক্তির জন্য দেওয়া ধর্মোপদেশ সম্বলিত পবিত্র গ্রন্থ। এতে পরম বাস্তবতাকে অভিজ্ঞতা করার জন্য ১১২টি ধ্যান প্রক্রিয়া (ধারণা) দেওয়া আছে। বিবেকানন্দ : উনবিংশ শতাব্দীর জীবনমুক্ত মাস্টার, রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য। তিনি রামকৃষ্ণ মিশন স্থাপনা করেন। ইউরোপ ও আমেরিকাতে হিন্দুধর্ম ও যোগ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। ব্রক্ষসূত্র : বা বেদান্তসূত্র; ব্রক্ষণের ওপরে ৫৫৫টি সূত্র বা বাণী সংগঠিত আধ্যাত্মিক গ্রন্থ। বলা হয় বেদব্যাস বা বদ্রায়াণ এর গ্রন্থকার। ব্রক্ষসূত্রে বেদান্তের বিভিন্ন শিক্ষাসমূহ হকে সমষ্টিগতভাবে যুক্তিসম্মত, প্রণালীবদ্ধ করা হয়েছে। ভগবত্ গীতা: আক্ষরিক অর্থ হল ভগবানের গীতা। এটি হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থের মধ্যে একটি। ভগবান কৃষ্ণ দ্বারা তাঁর শিষ্য অর্জুনকে সরাসরি উক্ত কথামৃত এতে লিখিত আছে; এতে পরমসত্য ও মুক্তির সুগন্ধসার আছে। ভগবত্ পুরাণ: আক্ষরিক অর্থ হল পরমেশ্বরের শাশ্বত ঐশ্বরিক ঘটনাবলী; শ্রী বেদব্যাস সংকলিত এই গ্রন্থ ঐশ্বরীয় প্রেমের সমৃদ্ধতম দর্শন। এটি জীবনের পথ ও লক্ষ্য নির্দেশিত করে এবং এতে ব্রক্ষাণ্ডের (অস্তিত্বের) বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস আছে। মনন : চিন্তন, contemplation, সনাতন ধর্মের অভ্যাসে শ্রবণ-মনন-নিদিধ্যাসনের মধ্যে দ্বিতীয়টি মনন। মহাজগৎ: ব্রক্ষাণ্ড, cosmos, universe মহাদেব-উপাদান : Mahadeva component মানিক্কবাসাগর : নবম শতকের তামিল সন্ত ও কবি; শিবভক্তির স্মৃতি তিরুবাসাকম্ লেখেন; শৈব-সিদ্ধান্ত তিরুমুরই-এর প্রধান গ্রন্থকার। মাদুরাই: বা তিরুম্যালাই। দক্ষিণ ভারতে মীনাক্ষীদেবী ও শিবের মন্দির-নগর। বৈদিক সংস্কৃতে সমৃদ্ধ একটানা অধ্যুষিত সবচেয়ে পুরাতন নগর। মাধবাচার্য: এক মহান সন্ত, দার্শনিক ও অবতার। তিনি বৈষ্ণবধর্ম ও তত্ত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত করেন। তত্ত্ববাদ হল বাস্তবতার দর্শন। তিনি বেদ, উপনিষদসমূহ ও ব্রক্ষসূত্র প্রস্থানের ওপরে বিস্তৃত ভাষ্য লেখেন। মাস্টার: গুরু, যিনি গু (অন্ধকার) থেকে রু-তে (আলোক) পরিচালনা করেন; যিনি জন্মমৃত্যুচক্র থেকে মুক্ত করেন। মুক্ত চিন্তাধারা : liberated thinking যোগ : অস্তিত্ব, চৈতন্য অথবা ঈশ্বরের সাথে একীভূত হওয় যাবার অবস্থা। যোগসূত্র : যোগের পিতা পতঞ্জলি লিখিত যোগের ওপরে গ্রন্থ। যোগী : যিনি দেহ-মন-সত্তা সহকারে ঈশ্বর অথবা চৈতন্যের সাথে একীভূত। রামকৃষ্ণ পরমহংস : বাংলার দক্ষিণেশ্বরে ঊনবিংশ শতকে কালীভক্ত অবতার এবং ঈশ্বরমূখ হয়ে সমাধিতে থাকতেন। বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্য ছিলেন। রামদাস : মহারাষ্ট্রে সপ্তদশ শতকের সন্ত ও কবি। তিনি প্রভু রাম ও হনুমানের পরমভক্ত ছিলেন। রামানুজ বা রামানুজাচার্য : একাদশ শতকের এক অবতার ও বিশিষ্ট-অদ্বৈত তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা। হিন্দু দর্শনের এক মহানতম শিক্ষক। সনত, সনতকুমার, সনাতন, সনকাদি ঋষিগণ : চার চিরতন যুবা ঋষি; তাঁরা দক্ষিণামূর্তিরূপী শিবের শিষ্য। সনাতন ধর্ম : ধর্মনিষ্ঠ জীবনের শাশ্বত পথ (পরে একে হিন্দুধর্ম বলা হয়); বিবর্ধনের সম্ভাবনা সহকারে পরম সত্যের সবচেয়ে শক্তিময়, সূক্ষ্ম ও বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন উপস্থাপনা। এটা রিলিজিয়ান (religion) নয়, এটি জীবন, মৃত্যু ও তা ছাড়িয়ে এক পূর্ণ বিজ্ঞান। সন্ন্যাস : পার্থিব জীবনের সাথে পূর্ণত্ব করে তা পরিত্যাগ করা; অন্যদের সমৃদ্ধ করার জন্য বাস করা। সমাধি : মন-বিহান, চিন্তা-বিহান অবস্থা; এই অবস্থায় মানুষ তার আদি অবস্থায়, মুক্ত অবস্থায় চলে যায়। সারিবদ্ধ : Aligned সংস্কৃত : সমস্ত ভাষার উৎস; দেবভাষা; স্বরবিষয়ক স্পন্দনের ওপরে ভিত্তি করা ঐশ্বরিক ভাষা। সিদ্ধ : নিখুঁত বিশুদ্ধ সত্তা, তাঁর জৈব-স্মৃতিকে পরিপূর্ণভাবে রাঁধা (সিদ্ধ) হয়েছে। স্তোত্র : পবিত্র ভক্তি সম্বলিত অন্তরাকাশ থেকে স্তবগান, স্তুতি বা বন্দনা। সৎসঙ্গ : সত্যের সাথে থাকা; এক জীবনমুক্ত মাস্টারের দেওয়া সত্য সম্বন্ধে আধ্যাত্মিক কথন বা ধর্মোপদেশ। শিব : মহাদেব, দেবাদিদেব মহাদেব, হিন্দুদের ত্রিদেবের (ব্রক্ষা, বিষ্ণু, মহেশ্বর) মধ্যে নবতেজোদ্দীপ্তকারী মহেশ্বর। শিব অর্থ ‘কারণবিনা শুভতা - মঙ্গলত্ব’। এই মঙ্গলত্বই তো অস্তিত্বের মূল সারপদার্থ। শিবগণ : শিবকে পূর্ণরূপে অন্তরাকাশে গ্রহণকারী এক দল সত্তা; কৈলাশে শিবের সেবকবৃন্দ। শিব-সূত্র: ‘বিজ্ঞান ভৈরব তন্ত্র’-এ বর্ণিত শিবোহম্ : শিব অহম্, শিব আমি। এটি মহাবাক্য বা মহামন্ত্র যা ঘোষণা করে তোমার ভিতরে ‘আমি’ হল ‘শিব’, তুমিই পরম চৈতন্য, সর্বোচ্চ সম্ভাবনা যা তুমি প্রত্যক্ষবৎ স্মরণ করতে পার। শৈব-প্রথা : বৈদিক প্রথার বিস্তার্ণ এই শাখাতে ভগবান শিবকে পরমেশ্বর মান্য হয়। ভক্তরা বিভূতি ও রুদ্রাক্ষ ধারণ করে ও তাদের শৈব বলা হয়। শংকর : আগে ‘আদি শংকর’-এ বর্ণিত। উভয়ই এক। শ্রুতি : যা শ্রবণ করা হয়েছে। শ্রুতি নির্দেশ করে প্রাচীন শাস্ত্রসকল যেমন, বেদ, উপনিষদসমূহ ও ভগবৎ গীতাকে; এইসকল প্রকাশিত শাস্ত্রসকলকে ঋষিরা কেবল একবার শ্রবণ করে ধরে রাখতে পেরেছেন। হিলিং: (ইংরাজীতে Healing) নিরাময় করা
টীকাপঞ্জ
পরমপূজ্য পরমহংস নিত্যানন্দ সম্বন্ধে পরমপূজ্য পরমহংস নিত্যানন্দ আজ অখও সনাতন ধর্মের এক সুস্পষ্ট, রীতিসিদ্ধ, রাজনীত উদাসীন প্রবক্তা হিসাবে স্বীকৃত। বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের কাছে তিনি অতিচেতনার জীবন্ত অবতার বলে পূজিত। হিন্দুদের সবচেয়ে প্রাচীন শীর্ষস্থানীয় আখড়া মহানির্ৰাণী পীঠের তিনি এক মহামগুলেশ্বর। ইউ টিউ বে (Youtube.com) সর্বাধিক জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক শিক্ষক হিসাবে তাঁর বিভিন্ন ভাষণ কয়েক কোটি বার দেখা হয়েছে। তিনি ৩০০-এর অধিক গ্রন্থের রচয়িতা এবং সেগুলি ২০টির বেশী ভাষায় প্রকাশিত। তাঁর ভাষণ প্রতিদিন লাইভ দেখা যায় http://www.nityananda.tv তে। এবং আন্তর্জাতীয় চ্যানেলে এবং ভিডিও কনফারেন্সিং করে। পরমহংস নিত্যানন্দকে আজ বিশ্বে চেতনা ও কৃগুলিনী জাগরণ বিষয়ে বিশিষ্টতম বিশেষজ্ঞ বলে গণ্য করা হয়। তিনি সফলভাবে যোগ-বিজ্ঞানের নানা রহস্য যেমন, আধ্যাত্মিক নিরাময় (হিলিং), লঘিমা (লেভিটেশন), টেলিপোর্টেশন (Teleportation), মেটেরিয়ালাইসেশন (Materialisation), বার্ধক্য-বিপরীত (Anti-aging), নিরাহার ইত্যাদি উদ্ঘাটিত করেছেন। তাঁর অসাধারণ আধ্যাত্মিক প্রতিভার জন্য ম্যানেজমেন্ট থেকে মেডিটেশন (ধ্যান), রিলেশনশিপ থেকে রিলিজিয়ান্ এবং সফলতা থেকে আধ্যাত্মিকতা বিষয়ে তিনি প্রচুর অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ করেছেন। নিত্যানন্দ আমাদের জন্য নিয়ে এসেছেন ব্যবহারিক প্রজ্ঞতা, ধ্যান-প্রক্রিয়া এবং অন্তরের স্থায়ী ক্রপান্তরের জন্য পদ্ধতি সমূহ। পরমহংস নিত্যানন্দ বিশ্বজুড়ে কতিপয় অলাভজনক সংস্থার আধ্যাত্মিক প্রধান। এই সংস্থাগুলি ব্যক্তিগত রূপান্তরের কার্যক্রম ও কোর্স , পুস্তক প্রকাশনা, আধ্যাত্মিক হীলিং এবং মানবহিতৈষী সেবা দ্বারা জীবনকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। এক বিশ্বপ্রেমী লোকহিতব্রতী হয়ে পরমহংস নিত্যানন্দ বিশ্বশান্তি প্রচারের জন্য মানুষের রূপান্তরের মাধ্যমে কাজ করছেন। তাঁর আধ্যাত্ম ক মিশনে বিশ্বব্যাপী আশ্রম ও কেন্দ্রগুলি অন্তর্ভুক্ত। এই আধ্যাত্মিক ল্যাবোরেটারীগুলিতে অন্তরের বিকাশ প্রগাঢ় এবং বহিরবিকাশ এক স্বাভাবিক পরিণাম। সেবা কার্যসমূহের মধ্যে আছে বিশ্বজুড়ে ধ্যান-শিবির, নেশামুক্তি শিবির, নিঃশুল্ক চিকিৎসা শিবির, কৃত্রিম প্রত্যঙ্গ দান, গ্রামাঞ্চলে শিশুদের সহায়তা, কোয়েদের জন্য ধ্যান শিবির, বন্যা পীড়িত অঞ্চলে ত্রাণকার্য পরিচালনা করা। ভারতীয় সংস্কৃতি ও প্রাচীন বৈদিক ঐতিহ্য সম্বন্ধে আন্তরাতিকীয় সচেতনতা সৃষ্টি করার জন্য পরমহংস নিত্যানন্দ গভীরভাবে সমর্পিত। জী বনমুক্ত অতীন্দ্রিয়বাদী, আধ্যাত্মিক বিবর্ধন সহায়ক, প্রশিক্ষিত যোগী, শক্তিধর হীালর ও সিদ্ধ হিসাবে পরমহংস নিত্যানন্দ পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর প্রামাণিকতা ও অভিজ্ঞতার গভীরতা এবং আধ্যাত্মিকতাকে ব্যবহারিক ও উপভোগ্য করার বিরল প্রতিভার জন্য তাঁর শিক্ষাগুলি দূর দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে। তিনি হাজার হাজার ব্যক্তির বিষণ্ণতা থেকে ক্যাঙ্গারের মত রোগ হিলীং (নিরাময়) করেছেন – প্রায়ই একবারমাত্র স্পর্শ ক’রে। প্রতি বছরে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের সাথে কার্য ও শেয়ার করে পরমহংস নিত্যানন্দ এবং তাঁর মিশন মানবতাকে পরের যুগান্তকারী ধাপ, অতিচেতনাতে নিয়ে যাবার জন্য বদ্ধ পরিকর। Over 2000 free talks on www.youtube.com/lifeblissfoundation Crossing 16 million views. Visit homepage: www.Nithyananda.org Live online morning satsangh by Paramahamsa Nithyananda via live streaming at www.Nithyananda.tv and video conferencing, viewed in thousands of places in over 40 countries every day. Over 250 e-books available for free online reading: http://lifeblissprograms.org/books Over 300 books of Paramahamsa Nithyananda's teachings published in 27 languages. email Nithyananda University Press: [email protected]