Books / কেন দুঃখকষ্ট

1. কেন দুঃখকষ্ট

আমরা কেন দুঃখকষ্ট পাই?

জীবনে আমরা প্রায় সবাই কোন না কোন সময়ে দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে গেছি। এখন যদি আমি তোমাদের জিজ্ঞাসা করি, “তুমি কষ্টভোগ করা কেন বেছে নিলে? তোমার কষ্ট পাওয়া কি প্রয়োজন ছিল?” তুমি নিশ্চয় সেটাকে একটা উন্ট্ট প্রশ্ন ভাববে। ‘কেউ কখনও কষ্ট পাওয়াকে বেছে নেয় নাকি?’ তোমরা আমাকে প্রশ্ন করবে। ‘দুঃখকষ্ট আমাদের সাথে ঘটে, ব্যস। আমাদের কিছুই করার নেই!’ কিন্তু সত্য হল, দুঃখকষ্ট এক পছন্দ (চয়েস)! আমি যদি বলি তোমার দুঃখকষ্ট হল কারনিক, তাহলে যেন অন্যায় ও অসহ্য বলে হওয়া হবে, কারন তোমার দুঃখকষ্ট তোমার কাছে তো বাস্তব। দুঃখকষ্টে না ভোগার বিকল্প তো তুমি নিজেকে কখনও প্রদান কর নি। কোনও বিকল্প আছে বলে তুমি তো জানতেও না। দয়া করে বোঝ : দুঃখকষ্ট জীবনের অবস্থা নয়; সেটা হল মনের অবস্থা। সেটা এক অন্তঃস্থ ঘটনা, বহিঃস্থ ঘটনা নয়! কোন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তুমি কষ্ট পাও কি না পাও, তা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে তুমি সেই পরিস্থিতিকে কিভাবে বেছে নাও। কিন্তু এখন প্রশ্নটির দিকে সচেতনভাবে তাকাও : 2

আমাদের দুঃখকষ্ট কখন হয়?

আমাদের দুঃখকষ্ট কখন হয়? তুমি কখন অসুস্থ হও? তোমার প্রতিবেশী কখন একটা নতুন গাড়ি পায়? কখন তোমার সাথে অন্য কারো কাচে যাবার জন্য তোমাকে ছেড়ে যায়? এখন ধর তুমি নির্বয় নিলে, কোন ক্রোধ বা প্রতিশোধ বিনা এই পরিস্থিতিগুলিকে মেনে নেবে। তুমি কি একইভাবে কষ্ট পাবে? আর যাই হোক, তোমার প্রতিবেশী নতুন গাড়ি নিলে তাতে তো প্রকৃতপক্ষে আঘাত পাবার কিছুই নেই! প্রিয়জন দেহত্যাগ করার অর্থাৎ চলে যাবার মুহূর্তটিতে যদিও বেদনা থাকে, তুমি তো সেটাকে পাল্টাতে পার না। প্রতিরোধ করার পরিবর্তে মুহূর্তটিকে স্বীকার করে নিলে, তুমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুঃখকষ্টের মাত্রা কমিয়ে ফেল। দুঃখকষ্ট সর্বদা, সর্বদাই বর্তমান মুহূর্তকে বাধা দিলে জন্ম নেয়! যখন তুমি বাধা দেওয়া বন্ধ কর, দুঃখকষ্ট বন্ধ হয়! একটা ছোট গল্প : এক ব্যক্তি তিনতলার জানালা থেকে নীচে গড়ে গেল এবং দৈবক্রমে বেঁচে গেল। তাকে এক বস্তু হাসপাতালে দেখতে গেল। 'পড়তে কি খুব ব্যথা লেগেছে?' বস্তুটি বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করে। ব্যক্তিটি উত্তর দিল, 'ও, না না! পড়ার সময় কোন ব্যথাই লেগে নি। মাটি ছোঁয়াতে ব্যথা লাগল!' যতক্ষণ তুমি প্রবাহের সাথে যাও, কোন বেদনা, কোন দুঃখকষ্ট থাকে না। যখন জীবনের পথে তোমার ধারণা ও প্রত্যাশা রাখ, তুমি সেই প্রবাহে বাধা সৃষ্টি কর। আর প্রায়শ, বেদনা এড়াবার জন্য তুমি যে প্রতিরোধ খাড়া কর , তা ঘটনাটির থেকেও বেশী কষ্ট প্রদান করে! দুঃখকষ্টের কারণ কি? আমি বলতে পারি, দুঃখকষ্টের কারণ খোঁজাই দুঃখকষ্টের কারণ! যতক্ষণ চিন্তা কর যে তোমার বাইরে কিছু আছে যা তোমার দুঃখকষ্টের জন্য দায়ী, তুমি দুঃখকষ্ট পেতেই থাকবে। বড় জোর, সেইগুলিই তোমার দুঃখকষ্টের যুক্তি অথবা অজুহাত হতে পারে, কিন্তু নিশ্চিত সেগুলি তোমার দুঃখকষ্টের কারণ হতে পারে না। একটা দরকারী জিনিষ তোমাকে বুঝতে হবে, বেদনা অনিবার্য হলেও, বেদনা থেকে যে দুঃখকষ্টের উদয় হয় তা অনিবার্য নয়। উদাহরণস্বরূপ, কোথাও আঘাত পেলে, সেখানে তো বেদনা হবেই, কিন্তু সেই ব্যথা থেকে কতটা দুঃখকষ্ট পেতে হবে তা তো তোমারই বেছে নেওয়ার কাজ।

প্রতিটি মুহূর্ত যেমন, ঠিক তেমনটি স্বীকার করে জীবনযাপন কর

এটা এক মনোভাবের ব্যাপার! বেদনা হয়ত অনিবার্য, কিন্তু দুঃখ পাওয়া তোমারই বেছে নেওয়ার কাজ। দুঃখকষ্ট জীবনের অবস্থা নয়, সেটা মনের অবস্থা। সেটা তোমার জীবনের ঘটনা নয়, সেটা ঘটনাতে তোমার সাড়া দেওয়া। বুদ্ধ 'তথ্যাত' শব্দটি ব্যবহার করেন - যেভাবে আছে ঠিক সেভাবে দেখা। যেভাবে আছে সেভাবেই দেখা - কোন রায় বা বিচার বিনা। কিন্তু বেশীরভাগ সময়ে, আমরা জিনিষগুলিকে কেবল আমাদের বেদনার ফিল্টারের (ছাকনি) মধ্য দিয়ে দেখি। যখন সবকিছু যেমন আছে তেমনটি দেখি, তখন শুধুমাত্র আনন্দ থাকে এবং আনন্দ থাকলে তোমার মধ্যে কোন চিন্তা রেকর্ড (নথিভুক্ত) হয় না। সেখানে কেবল শূন্য আকাশ থাকে। সেইজন্য, আনন্দিত হলে তুমি হালকা অনুভব কর, কারন কিছুই রেকর্ড হয় না। যখন তুমি সবকিছুকে বেদনার মধ্য দিয়ে দেখো, তোমার মধ্যে আরও বেশী চিন্তা রেকর্ড হয় ও তুমি ভারী অনুভব কর। একটা উক্তি আছে, 'জিনিষগুলি যেমন, ঠিক তেমনভাবে আমরা দেখি না। আমরা যেমন, সেভাবে আমরা জিনিষগুলিকে দেখি' তুমি ক্ষমতাহীন হলে, তোমার পরিবেশকে তুমি তোমার চেয়ে ক্ষমতাবান বানাও। যখন তুমি ক্ষমতাপূর্ণ হও, তুমি তোমার পরিবেশকে তোমার সামনে ক্ষমতাহীন করে ফেল। যদি অনুভব কর, যা দেখছ তাতে খারাপ কিছু আছে, তাহলে তোমাকে নিজের ভিতরে তাকিয়ে দেখা উচিত, কারন তোমার পরিবেশ তো কেবল তোমার ভিতরে যা আছে তারই প্রতিফলন। যদি তুমি অন্তরে পবিত্র প্রেম অনুভব কর, তখন বাইরেও পবিত্র প্রেম অবলোকন কর। সর্বদাই সেটা 'তোমার' সাথে সংযুক্ত, তুমি যা দেখছ তার সাথে নয়। কষ্টভোগ হল তোমার প্রত্যক্ষকরণ কেউ জীবনমুক্ত মাস্টার যে কৃষ্ণমূর্তিকে জিজ্ঞাসা করেছিল কিভাবে যা যেভাবে আছে তার সাথে নিজের সুর বেঁধা যায়। তিনি সুন্দরভাবে বলেছিলেন , 'সেটাকে কোন নাম দিও না, দেখবে তুমি তার সাথে সুর বেঁধে ফেলেছ!' সাধারণত কিছু দেখলে, হয় তুমি সেটার সাথে শনাক্ত করার চেষ্টা কর বা সেটাকে বর্জন (condemn) করার চেষ্টা কর। যাকে দুঃখকষ্ট বল, তা যখন তুমি অভিজ্ঞতা কর, তুমি হয় সেটাকে স্বীকার কর অথবা কিছু না পালাবার চেষ্টা কর! তুমি কখনও বোঝ না বা দুঃখকষ্টকে ছাড়িয়ে যাও না। তুমি কেবল তোমার প্রসঙ্গের কাঠামোর পরিস্থিত সীমিত দৃষ্টিপথে আটকে যাও। বাস্তবিকভাবে বুঝতে হলে, তোমাকে এই সীমিত দৃষ্টিকোণ ছাড়িয়ে যেতে হবে। সেটা করার জন্য, তোমাকে সেই ব্যাপারটাকে দুঃখকষ্ট নাম দেওয়া বন্ধ করতে হবে, ব্যস! তাহলে আর কোন দুঃখকষ্ট থাকবে না। কেবল সেটাকে নাম দিয়ে তুমি সংঘাত শুরু কর। এইভাবে যা যেভাবে আছে, তুমি তাকে সেভাবে দেখা - তাকে কোন নাম না দিয়ে। একটা ছোট গল্প : এক ব্যক্তি বাসে চড়ে একজনের পাশে বসল। ব্যক্তিটি দেখল পাশের লোকটি একটা হিপি। সে কেবল একটা জুতাই পরেছিল। ব্যক্তিটি জিজ্ঞাসা করে, 'আপনি কি একটা জুতাই হারিয়ে ফেলেছেন?' যুবকটি উত্তর দেয়, 'না, আমি একটা জুতা পেয়েছিল।' কোন পরিস্থিতি, কোন মানুষ বা বস্তকে নাম দেওয়া বন্ধ কর ! শুধু দেখো, ব্যস। দোষ দেওয়া বা স্বীকার করার চিন্তাগুলিকে কোন জায়গা দিও না। প্রাথমিকভাবে যা কিছু দেখা তাতে রায় দেবার বাধ্যবাধকতা থাকে কারন সেটা তোমার স্বভাব। কিন্তু যা যেভাবে আছে সেভাবে দেখে যখন তোমার মধ্যে বিরাট শক্তি বিমুক্ত হওয়া অভিজ্ঞতা কর, তখন তুমি সেইভাবেই থাকতে চাও - চিন্তা, উদ্বিগ্নতা ও দুঃখকষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে।

বারংবার 'যা যেভাবে আছে'-তে ফিরে আসা

প্রক্রিয়া যা যেভাবে বাস্তবিক আছে, তা থেকে পালাবার চেষ্টা করাকে তুমি কিভাবে বন্ধ করতে পার? কিভাবে প্রতিটি মুহূর্তকে সর্বদা উপভোগ করতে পার ? এই ছোট প্রক্রিয়াটি চেষ্টা কর : যখন কিছু দ্যাখো, যেমন কোন ব্যক্তি বা পরিস্থিতি বা বই বা যা কোনকিছু, সাধারণত পুরানো চিন্তা ও পরিচিত প্রতিক্রিয়াগুলি তোমার মধ্যে তৎক্ষণাৎ উদিত হয়। সজাগতা নিয়ে এসো যে এই প্রভাবিত চিন্তা ও স্মৃতিসকল তোমার বিচারকে আচ্ছাদিত করছে এবং সেই চিন্তাগুলিকে চূড়ান্ত বলে প্রত্যক্ষ কর। তারপরে সেই পরিস্থিতি, ব্যক্তি বা বস্তুটিকে এখন এক তরতাজা চোখ দিয়ে দ্যাখো, যেন সেটাকে প্রথমবার দেখছ হঠাৎ দেখবে, তোমার নিজের ধারণা ও চিন্তার জন্য তুমি কতই না মিস্ করেছ। এমনকি নিজের পা, পাতা, গাছ বা কাউকে যখন দ্যাখো, তাদের এমনভাবে দ্যাখো যেন তাদের প্রথমবার দেখছ হঠাৎ তুমি উপলব্ধি করবে যে পুরানো দুঃখকষ্ট আর ফিরে আসছে না এবং তুমি সবাইকে এক দেখতে শুরু করেছ, সে তারা পরিচিত হোক কি অপরিচিত হোক। সেটাই সঠিক উপায়। কেউ পরিচিত নয় অথবা অপরিবর্তনীয় নয়। এমনকি নিজের পত্নীকেও তোমার জানা নেই! প্রত্যেকে অনস্তিত্বের সাথে প্রতিটি মুহূর্তে অবিরত পরিবর্তিত হচ্ছে। কেবলমাত্র তোমার মন তাদের চিরস্থায়ী মনে করাবার চেষ্টা করছে। একবার তুমি যা যেভাবে আছে সেভাবে দ্যাখা আরম্ভ করলে, তোমার সম্পূর্ণ শক্তি তোমার মধ্যে সুসংহত হবে। কোন দুশ্চিন্তা, কোন সংঘাত থাকবে না। যা দ্যাখো তাতে তোমার চিন্তাগুলি বাঁধা দিলে সংঘাত ঘটে। একবার সংঘাত মিলিয়ে গেলে যে শক্তিকে দুঃখকষ্ট বিনিয়োগ করা হয়েছিল তা উন্মোচিত হয় এবং তুমি মুক্ত হও।

তুমিই সম্পূর্ণরূপে দায়ী

অন্যান্য ব্যক্তি ও বাইরের ঘটনাগুলিতে আবেগভরে বেশী করে বিনিয়োগ করলে দুঃখকষ্ট ঘটে। আর যাই হোক, সেগুলির ওপরে তোমার কত নিয়ন্ত্রণ আছে? তুমি অনুপ্রেরণার নিজের উৎস হও। তোমার প্রসন্নতাকে অপরের কাছে বন্ধক রেখো না! স্মরণ রেখো, নিজের কষ্ট ও নিজের প্রসন্নতার জন্য তুমিই সম্পূর্ণরূপে দায়ী। এটাই কঠিন সত্য! একটি গল্প : এক শিষ্য মাস্টারকে বারবার জিজ্ঞাসা করতে থাকে, ‘মাস্টার, স্বর্গোদ্যান কোথায়?’ পথে মাস্টার একদিন তাকে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি সত্য জানতে চাও?’ শিষ্য তৎপর হয়ে বলে, ‘হ্যাঁ!’ মাস্টার বলেন, ‘ঠিক আছে, আমার প্রথম শিষ্য স্বর্গোদ্যানে আছে।’ এই কথা বলে মাস্টার চোখ বন্ধ করলেন ও ধ্যানে চলে গেলেন। শিষ্যটি জানত যে মাস্টার চোখ খুলতে অনেক সময় নেবেন। তাই সে অন্য শিষ্যদের জিজ্ঞাসা করল যে প্রথম শিষ্যটি কোথায় থাকে। দেখা গেল, কেউ তা জানত না। পরে একটি শিষ্য বলল, ‘তোমাকে সেখানে যাবার রাস্তা বলতে পারি, কিন্তু আমি নিজে সেখানে কখনও যাই নি। বরকফে ঢাকা পর্বতমালা ছাড়িয়ে সে এক গভীর উপত্যকাতে আছে।’ শিষ্যটি সতর্কভাবে যাবার রাস্তা লিখে রাখল এবং মাস্টারের কাছে ফিরে গেল। সে তাকে বলল, ‘মাস্টার, আমি আপনার প্রথম শিষ্যের কাছে যেতে চাই!’ মাস্টার কোন কাজে গভীরভাবে মগ্ন ছিলেন। মাথা না তুলেই তিনি বললেন, ‘এগিয়ে যাও।’ শিষ্য তার যাত্রা শুরু করল। সে অনেকদিন চলতে থাকল, রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ারপাতা আরও কতকিছুর মধ্য দিয়ে চলতে থাকল সে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ল, প্রায় মৃত্যুর মুখে। উপত্যকায় পৌঁছাতে তার একশ দিন লেগে গেল। অবশেষে উপত্যকায় পৌঁছানোর পরে সে চারিদিকে তাকিয়ে ভাবল, ‘এই উপত্যকাতেই তো অত ভাল দেখছি না। আমি এর চাইতে সুন্দর উপত্যকা দেখেছি। মাস্টার এটাকে কেন স্বর্গোদ্যান বলেন?’ আশেপাশে দেখতে দেখতে সে আরও এগিয়ে গেল ও সর্বশেষে প্রথম শিষ্যের কুঁড়েঘর দেখতে পেল। প্রথম শিষ্যটি তাকে দেখে খুব খুশী। সে তাকে খাবার দিল এবং মাস্টার ও অন্যান্য শিষ্যের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করল। সর্বক্ষণ শিষ্যটি মনে মনে ভাবছিল, ‘মাস্টার এই জায়গাটিকে স্বর্গোদ্যান বলেন? আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’ এক সপ্তাহ সেখানে থেকে সে বিদায় নিল এবং মাস্টারের কাছে ফিরে এল। ফিরতে ফিরতে তার আরও এক দিন লেগে গেল। সে সোজা মাস্টারের কাছে গিয়ে বলল, ‘আপনি বললেন সেই জায়গাটি স্বর্গোদ্যান। কিন্তু আমি তো সেটাকে একটা অতি সাধারণ জায়গা দেখলাম!’ মাস্টার বললেন, ‘হে ঈশ্বর! তোমার জিজ্ঞাসাবাদের সময় যদি আরও স্পষ্ট করে তোমার অভিপ্রায় ব্যক্ত করতে আমি তোমাকে সত্যটি বলতাম!' শিষ্য প্রশ্ন করে, 'সত্য কি?' মাস্টার উত্তর দিলেন, 'সে স্বপ্নদোষে নেই! স্বপ্নদোষ তার ভিতরে আছে!' যখন তুমি যা যেভাবে আছে সেভাবে দ্যাখো, তুমি স্বর্গে আছ। যখন তুমি যা দেখতে চাও, তাই দেখতে চাও, তুমি নরকে আছ। যদি তুমি বোঝো যে সবকিছুই মঙ্গল, তাহলে তুমি প্রত্যাশা ছেড়ে দেবে এবং জিনিষগুলি যেভাবে আছে সেভাবেই দেখবে, কারণ সবকিছুই মঙ্গলকর। যখন কোন প্রত্যাশা বিনা তুমি অস্তিত্বের কাছে বাস কর এবং যা যেভাবে আছে সেভাবেই দ্যাখো এবং তার মধ্যে আশীর্বাদ দেখতে পার, তুমি তোমার মধ্যে স্বর্গকে বহন করবে! স্বর্গ ভৌগলিক নয়, তা হল মানসাত্মিক। সেটা স্থুল নয়, সেটা মানসিক। যদি তুমি নির্ণয় নাও, তুমি এক্ষুণি স্বর্গে থাকতে পার। দুঃখকষ্টকে ভর করে তোমার আমিত্ব বর্ধিত হয় দুঃখকষ্ট ছাড়া তোমার আমিত্ব থাকতে পারে না। দুঃখকষ্ট হল তোমার আমিত্বের মূলে। এই গুরুগম্ভীর জিনিষটাকে তোমার বোঝা প্রয়োজন। আমরা সর্বদা ভাবি যে আমিত্ব দুঃখকষ্ট দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়। না! আমিত্ব দুঃখকষ্ট দ্বারা সমৃদ্ধ হয়। যদি তোমার দুঃখকষ্ট কম হয়, তোমার আমিত্ব নিজেকে খুব ছোট মনে করে! তুমি জ্বলছ তুমি খুবই ছোট, তাই তুমি তোমার দুঃখকষ্ট বাড়াও, যাতে তুমি অনুভব করতে পার যে তুমি কেউ একজন। অনেক সময় তুমি হয়ত দেখেছ যখন কেউ তোমাকে কিছু বলে, তোমার মধ্যে প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় এক বাধা, একটা 'না'। যখন তুমি 'না' বল, সেটা আমিত্বকে তুষ্টি প্রদান করে। তুমি নিজের ভিতরে শক্ত ও দৃঢ় অনুভব কর। যখন তুমি 'হ্যাঁ' বল, তুমি জলবৎ, বেদ্য ও অসুরক্ষিত অনুভব কর। তোমার আমিত্ব বশবর্তী অনুভব করে ও সেটা অস্বস্তিকর হয়; তাই তুমি বল 'না'। নিয়মকানুনকে 'না' বলে তোমার আমিত্বের শক্তিবৃদ্ধি হয়। সেইজন‍্য বাড়ীতে, স্কুলে, কর্মক্ষেত্রে বা গাড়ী চালাবার সময় আইন ভাঙতে তোমার ভাল লাগে। আইনকানুনকে 'না' বলে তুমি অনুভব কর যে তোমার আমিত্বের শক্তিবৃদ্ধি ঘটছে। এটা যৌনতৃপ্তির ন‍্যায় দেখতে পাওয়া যায় যখন তুমি বল যে কিছু জিনিষ তাদের জন‍্য নয়, তারা কেবলমাত্র সেগুলিই চাইতে থাকবে!

দুঃখকষ্টকে ভর করে তোমার অমিত বৃদ্ধি হয়

তুমি তোমার জীবনকে দুঃখকষ্ট দিয়ে মাপ একই কারণে যদি তোমার দুঃখকষ্ট বিরাট হয়, তোমার ভাল লাগে, তোমার আমিত্ব তুঙ্গে থাকে। তোমার দুঃখকষ্টের পরিমাণ দ্বারা তুমি নিজের জীবনকে মাপ। অজ্ঞাতে তুমি অন্যের ও নিজেকে নিপীড়ন কর। যত বেশী কষ্ট পাও, তোমার আমিত্ব ততই বলবান হয়। তাই তুমি সর্বদাই তোমার কষ্টকে বাড়িয়ে বল। তুমি চারদিকে যাও এবং বল, ‘ও, আমার জীবন তোমরা জান না। আমর দুঃখকষ্ট তোমরা জান না।’ সমস্যা হল, কিছু সময় পরে ভুলে যাও যে তুমি বাড়িয়ে চড়িয়ে বলেছিলে। ভুলে যাও যে তোমার কষ্টকে তুমিই অতিরঞ্জিত করেছিলে। আর এখন সেই জালে তুমি জড়িয়ে পড়েছ। কিন্তু স্পষ্ট হও, তোমার সৃষ্টি করা জানেই তুমি ধরা পড়েছ। যখন তুমি তোমার আমিত্বের জন্য জীবনযাপন করার চেষ্টা কর, তুমি নিজের ও অন্যের জীবন দুর্দশাগ্রস্ত কর। বেশীরভাগ সময় তুমি যে দুর্দশা ভোগ কর তা অন্যরা সৃষ্টি করে নি। তুমি সেগুলি অজ্ঞাতসারে সৃষ্টি করেছ। তুমি হয়ত সেগুলি থেকে কোন উপকার পাবে না কিন্তু কেবল তোমার আমিত্বকে প্রমাণ করার জন্য তুমি সেগুলি সৃষ্টি কর। তুমি ভাব দুঃখকষ্ট তোমাকে অসাধারণ বানায় সাধারণ জীবনে গড়পড়তা প্রতিটি মানুষ নিজেকে অসাধারণ ভাবে। সর্বাধিক কষ্ট পেয়েছে, এরকম ভেবে তোমার আমিত্ব স্বস্তি পায় যে তুমি এত কঠিন জীবন পরিচালনা করতে সমর্থ হয়েছ। কেবল তোমার শক্তি বিরাট হলে নিজেকে বড় বলে অনুভব কর। শক্তি ছোট হলে নিজেকে ছোট অনুভব কর। তাই যত বড় তোমার আমিত্ব, তোমার দুঃখকষ্ট তত বেশি! কেবল যখন তোমার আমিত্ব থাকে না, তুমি নিজেকে ও জীবনকে সত্যসত্যই উপভোগ করতে পার। আমিত্ব থাকলে তুমি উপভোগ করতে পার না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি মেক-আপ লাগাতে পার যাতে অন্যরা তোমাকে উপভোগ করতে পারে, কিন্তু তুমি নিজেকে উপভোগ করতে পার না। যে ব্যক্তির আমিত্ব নেই, যে নিজেকে দেহ ও মনের সাথে শনাক্ত করে না, শুধুমাত্র সে নিজেকে উপভোগ করতে পারে। যদি তুমি কোন জিনিষকে নিজের বলে ভাব, তুমি উপভোগ করতে পার না। কারণ কোনকিছুরকে নিজের বলে ভাবলে, তুমি তো সেই জিনিষ বা সম্বন্ধতা উপভোগ করার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলবে। একটা ছোট গল্প : জাপানে এক জীবনমুক্ত মাস্টার ছিলেন। তাঁর নাম সুজুকি। তাঁর মাস্টারের দেহত্যাগ করলে তিনি ভীষণভাবে কাঁদতে থাকলেন। একজন তাঁকে প্রশ্ন করল, 'আপনি জীবনমুক্ত। আপনার মাস্টারের দেহত্যাগে আপনি এত কাঁদছেন কেন?' সুজুকি উত্তর দিলেন, 'পূর্বজন্মে আমার মাস্টার এক অসাধারণ মানুষ ছিলেন' লোকটি দ্বাবড়ে গেল ও জিজ্ঞাসা করল, 'তাঁর সম্পর্কে এত অসাধারণ কি ছিল?' সুজুকি জবাব দিলেন, ‘আমি কখনও এরকম অসাধারণ মানুষ দেখি নি যে নিজেকে সবচেয়ে বেশী সাধারণ ভাবত!’ সুজুকির মাস্টার অসাধারণ ছিলেন কারণ তিনি নিজেকে অত্যন্ত সাধারণ ভাবতেন। এদিকে বিশ্বে প্রায় প্রতিটি মানুষ নিজেকে অসাধারণ ভাবে। যদি তুমি নিজেকে অসাধারণ ভাব, স্পষ্ট হও যে তুমি সাধারণ। যদি নিজে সাধারণ কিনা জানতে চাও তাহলে সেই পরীক্ষাটি কর। যদি অসাধারণ অনুভব কর, স্পষ্ট হও : তুমি গড়পড়তা। যদি গড়পড়তা অনুভব কর, তুমি অসাধারণ! আরেকটা ছোট গল্প: ভারতবর্ষে এক অহংকারী রাজা ছিল। তার আমিত্ব এত বেশী হয়ে গিয়েছিল যে সে ঘোষণা করা শুরু করল, ‘ভগবান যা করে আমি তা করতে পারি। আমি ভগবানের মতোই মহান!’ যদি কেউ রাজার অভিমতে আপত্তি করত, রাজা অবিলম্বে তাকে শূলে চড়াবার আদেশ দিত। সেই রাজ্যে একজন জীবনমুক্ত মাস্টার ছিলেন। রাজধানীতে এসে তিনি রাজার মনোভাব সম্পর্কে শুনলেন এবং রাজাকে সত্য দেখাতে চাইলেন। তাই তিনি রাজদরবারে গেলেন এবং রাজার উপস্থিত লৌহিক শৃঙ্খল ভেঙ্গে বললেন, ‘হে রাজন, আপনি তো ঈশ্বরের সমান। আপনিই তো ঈশ্বর।’ রাজা খুব খুশী। সে বলে, ‘হাঁ, আপনাকে তো খুবই বুদ্ধিমান ব্যক্তি মনে হচ্ছে। আমাদের বলুন আপনি আরও কি কি উপলব্ধি করেছেন।’ মাস্টার বললেন, ‘হে রাজন, আপনাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ বলতে হবে। আপনি তো এমন কিছু করতে পারেন যা ঈশ্বরও করতে পারেন না !’ এখন রাজা তো গর্বে ভরে যাচ্ছিল। সে বলে, ‘কি করে বলুন আমি এমন কি করতে পারি যা স্বয়ং ঈশ্বরও করতে পারে না?’ মাস্টার শান্তভাবে বললেন, ‘হে রাজন, আপনি কারও সাথে ক্রোধিত হলে তাকে আপনার রাজ্য থেকে বার করে দিতে পারেন, কিন্তু ঈশ্বর তা পারেন না।’ ঈশ্বর কখনও আমাদের তাঁর রাজত্ব থেকে বার করে দিতে পারেন না, কারণ ঈশ্বরের রাজত্ব, সেটাকে বলে জীবনমুক্তি, তাতে তো আমাদের জন্মাধিকার আছে!